ম্যাচ পাতানোর দায়ে নিষিদ্ধ দশ ক্রিকেট তারকা

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ ক্রিকেটকে বলা হয় ভদ্রলোকের খেলা। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে ম্যাচ পাতানোর কলঙ্ক এই তকমার গায়ে, সর্বোপরি খেলাটার সৌন্দর্য্যে বীভৎস আঁচড় বসিয়েই যাচ্ছে। স্পট ফিক্সিং এর দায়ে পাকিস্তানি তিন ক্রিকেটার সালমান বাট, মোহাম্মদ আসিফ আর মোহাম্মদ আমিরের আদালতে দোষী প্রমাণিত হওয়াটা নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা ক্রিকেট বিশ্বকে। এরপরেও সময়ে সময়ে ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ উঠে এসে খেলাটার মর্যাদায় আঘাত করেই যাচ্ছে।


946927_467107220032740_352903870_n (1)

ক্রিকেটের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, এর আগে অনেক খেলোয়াড়কেই খেলা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে ম্যাচ পাতানোর দায়ে। তাদের মধ্যে থেকে ১০ জনকে নিয়েই আজকের এ প্রতিবেদনঃ

Cricket - Australia v South Africa

১. হ্যানসি ক্রনিয়ে
ব্যাটিং এর যাদুকর শচিন টেন্ডুলকার যার বোলিং এর মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে কঠিন বলে মনে করতেন সেই হ্যানসি ক্রনিয়ের নামে ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ উঠে ২০০০ সালের এপ্রিলে, অভিযোগ উঠে তার তিন দক্ষিণ আফ্রিকান দলের সতীর্থ হার্শেল গিবস, নিকি বোয়ে আর পিটার স্ট্রাইডোমের নামেও। প্রথমে দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেট বোর্ড আর খেলোয়াড়েরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। কিন্তু ৩ দিন পরে ক্রনিয়েকে অধিনায়ক পদ থেকে ছাঁটাই করা হয় যখন তিনি স্বীকারোক্তি দেন যে তিনি “পুরোপুরি সৎ” ছিলেন না। ক্রনিয়ে ও তার সতীর্থরা বাজিকরদের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে ফাঁস করেন চমকজাগানিয়া সব তথ্য। অক্টোবরের ১১ তারিখে ক্রনিয়েকে ক্রিকেট খেলা বা কোচিং সব থেকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তার প্রায় ২ বছর পরে ৩২ বছর বয়সে বিমান দুর্ঘটনায় দুই জন পাইলটের সাথে প্রাণ হারান হ্যানসি ক্রনিয়ে।

azhar_020812

২. মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন
যতদিন দলের জন্য খেলেছেন ততদিন আজহারউদ্দিন ছিলেন দলের জাজ্জ্বল্যমান তারকা। ব্যাটিং, ফিল্ডিং এ ছিলেন দারুণ, ছিলেন এক অনুপ্রেরণাদায়ী অধিনায়ক। পরিসংখ্যানের দিক থেকে তিনি ভারতের ক্রিকেটের অন্যতম সফল অধিনায়ক, অধিনায়ক হিসেবে তার ১০৩টি ওয়ানডে জয়ের ভারতীয় রেকর্ড আজও ভাঙ্গেনি। কিন্তু হ্যানসি ক্রনিয়ে স্বীকারোক্তিতে যখন জানালেন যে আজহারউদ্দিনই তাকে বাজিকরদের সাথে পরিচয় করানোর মূলে তখন ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ এসে লাগে তারও গায়ে। সিবিআই এসবের তদন্ত করা শুরু করে এবং আজহারউদ্দিনও একসময় তিনটা ওয়ানডে ম্যাচ পাতানোর কথা স্বীকার করেন। ফলশ্রুতিতে বিসিসিআই ২০০০ সালে তাকে ক্রিকেট থেকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করে, যদিও ছয় বছর পরে তারা এ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।

10573822.cms

৩. মনোজ প্রভাকর
নব্বই এর দশকের শুরুর দিকে মনোজ প্রভাকর ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের অপরিহার্য অঙ্গ। বল হাতে ব্যাটসম্যানের ঘাম ছুটিয়ে ছাড়তেন তিনি। তার ক্যারিয়ার অবশ্য বেশিদিন টিকেনি, ১৯৯৫-৯৬ বিশ্বকাপের দল থেকে বাদ পড়ে সাথে সাথেই অবসর নিয়ে ফেলেন তিনি। ২০০০ সালে কপিল দেব ও অন্যান্য কিছু ক্রিকেটারকে ম্যাচ পাতানো বিতর্কে জড়াতে গিয়ে নিজেই ফেঁসে যান তিনি। ম্যাচ পাতানোর দায়ে দোষী প্রমাণিত হন তিনি এবং বিসিসিআই ৫ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে তাকে। পরে রাজনীতিতে ঢুকতে গিয়ে তিনি ব্যর্থ হন এবং কোচিং এর সাথে জড়িয়ে যান।

Herschelle-Gibbs_1

৪. হার্শেল গিবস
যে ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ ক্রনিয়ের ক্রিকেট ক্যারিয়ারকে ধ্বংস করছিল সেটাই হার্শেল গিবসের ক্যারিয়ারকে নাড়িয়ে দেয়। চোখে পানি নিয়ে তিনি স্বীকার করেন যে একটা ওয়ানডে ম্যাচে “২০ রানের কম” করতে অধিনায়ক ক্রনিয়ের কাছ থেকে ১৫,০০০ ডলার নিয়েছিলেন তিনি। তবে সেই কথা রাখেননি তিনি এবং সেই ম্যাচে বরং করেন ৭৪ রান। সেকারণে মাত্র ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় তাকে, যা কাটিয়ে তিনি ফিরে আসেন দক্ষিন আফ্রিকা দলে আর খেলোয়াড় হিসেবে পান পুনরুজ্জীবন।

166995-hanse-cronje

৫. হেনরি উইলিয়ামস
গিবসের মতই উইলিয়ামসও নাগপুরের এক ওয়ানডে ম্যাচে খারাপ খেলতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু এই দক্ষিণ আফ্রিকান বোলার কাঁধের ইনজুরিতে পড়ে নিজের বোলিং কোটা শেষ করতে পারেননি আর সেকারণে কোন টাকাও পাননি। তাকেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে ৬ মাসের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। ক্রিকেটার হিসেবে খেলায় আর ফিরেননি তিনি। পরে বোলিং কোচ হন বোল্যান্ডের।

479146-marlon-samuels

৬. মারলন স্যামুয়েলস
ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান এই ক্রিকেটারের ব্যাপারে ভারতীয় পুলিশ অভিযোগ তোলে যে তিনি ২০০৭ সালে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের আগে দলের তথ্য ফাঁস করেছিলেন এক বাজিকরের কাছে। পুলিশ দাবি করে যে তাদের কাছে স্যামুয়েলস ও মুকেশ কোচকার নামে এক বাজিকরের মধ্যকার ফোনালাপের রেকর্ড আছে। ২০০৮ সালে দোষী প্রমাণিত হওয়ায় আইসিসি তাকে দুই বছরের জন্য ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করে যদিও তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। নিষেধাজ্ঞার শেষে ক্রিকেটে ফিরে আসেন তিনি, খেলা শুরু করেন জ্যামাইকা ও পরবর্তীতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে।

1431633

৭. অজয় জাদেজা
দুর্দান্ত ফিল্ডিং আর ব্যাটিং এর বদৌলতে অজয় জাদেজা ছিলেন ভারতীয় দলের মধ্যমণি। সিবিআই এর করা তদন্তে তার ম্যাচ পাতানোর প্রমাণ পাওয়া গেলে বিসিসিআই ৫ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে তাকে। জাদেজা এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্টে আপিল করলেও কেউ কেস শুনানির জন্য তার হয়ে না দাঁড়ালে আপিল খারিজ হয়ে যায়। যদিও, পরবর্তীতে, তাকে ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলার সুযোগ দেওয়া হয়, অধিনায়কত্ব করেন দিল্লি, রাজস্থানের। বলিউডেও ক্যারিয়ার গড়ার চেষ্টা করেন তিনি, যদিও তাতে সাফল্য আসেনি।

odu

৮. মরিস ওদুম্বে
মরিস ওদুম্বে ছিলেন কেনিয়ার অন্যতম শীর্ষ ক্রিকেটার। ২০০৪ সালে তার বিরুদ্ধে ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ উঠলে আইসিসির কাছে তিনি বাজিকরদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন আর ক্রিকেট থেকে ৫ বছরের নিষেধাজ্ঞার দন্ড পান। সাসপেনশনের পরে, ওদুম্বে সমাজসেবার কাজে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যান, বিশেষত এইডসের কারণে এতিম হওয়া শিশুদের কল্যাণে। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ওঠার পরে ওদুম্বে ঘরোয়া ক্রিকেট দিয়ে খেলায় ফিরে আসেন।

Ajay-Sharma

৯. অজয় শর্মা
ঘরোয়া ক্রিকেটে একপ্রকার রানমেশিনই ছিলেন অজয় শর্মা, গড় ছিল ৬৭.৪৬। ঘরোয়া ক্রিকেটে অনেক রেকর্ড গড়লেও ভারতের জাতীয় দলে সুযোগ পেয়ে বিশেষ কিছু করে দেখাতে পারেননি। ম্যাচ পাতানোর দায়ে আজীবনের নিষেধাজ্ঞা পেয়ে তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়।

95243

১০. সেলিম মালিক
একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সময় ধরেই সেলিম মালিক ছিলেন পাকিস্তান দলের গুরুত্বপূর্ণ একজন খেলোয়াড়। দলের হয়য়ে অনেক স্মরণীয় ইনিংস খেলেছেন তিনি, একসময় তো অধিনায়কত্বও করেছেন। তার বিরুদ্ধে ঘুষ সাধার অভিযোগ আনা হয় এবং ২০০০ সালে ক্রিকেট থেকে আজীবনের নিষেধাজ্ঞা পান তিনি। ম্যাচ পাতানোর দায়ে নিষেধাজ্ঞা পাওয়া প্রথম ক্রিকেটার সেলিম মালিক। প্রথম থেকেই নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন মালিক, পরে দেখা যায় যে তার দাবি আসলেই সত্য। ২০০৮ সালে তার নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু ক্রিকেটে আর ফেরেননি তিনি।

সূত্রঃ মেনসএক্সপি.কম

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...