হুইল চেয়ারে ভ্রমণ ও এক আত্মবিশ্বাসী যুবকের জীবন কাহিনী

সত্যিই যদি এই কাহিনীটি আপনারা যদি পড়েন তাহলে বুঝবেন, মানুষের ইচ্ছা শক্তি থাকলে সে কতোদূর যেতে পারে

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ এমন এক যুবকের কাহিনী আজ আপনাদের তুলে ধরবো যার আত্মবিশ্বাস মানুষের বাঁচার পথ দেখাতে পারে। হুইল চেয়ারেও বসেও যে বিশ্ব জয় করতে চাই।

ফেসবুকে এমন একজন অসহায় অর্থাৎ প্রতিবন্ধিকর আত্মকাহিনী প্রকাশিত হয়েছে। সত্যিই আমরা কতো কাহিনী প্রতিদিন পড়ি, কিন্তু এমন আত্মকাহিনী আমাদের পড়া উচিত। সত্যিই যদি এই কাহিনীটি আপনারা পড়েন তাহলে বুঝবেন, মানুষের ইচ্ছা শক্তি থাকলে সে কতোদূর যেতে পারে।

ফেসবুকে লেখা শাহীন রেজা রাসেলের বক্তব্যটি নিচে তুলে ধরা হলো:

‘আমার জীবনে প্রথম ভ্রমণ অভিজ্ঞতা হয় ৭ বছর বয়সে। মায়ের স্কুলের সহকর্মীদের সাথে মেহেরপুরের মুজিবনগরে। এরপর থেকে ভ্রমণের প্রতি ভালবাসা তৈরি হয়ে গেল। পঞ্চম শ্রেণী পার হবার আগেই, রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি, লালন সাঁইজির আখড়া, ষাট গম্বুজ মসজিদ, সুন্দরবন ভ্রমণ করেছি। পঞ্চম শ্রেণীতে থাকতে বন্ধু পল্লবকে নিয়ে গড়ে তুলেছিলাম বার্ড ক্লাব। আমরা দুই বন্ধু একটা ভাঙ্গাচোরা বাইনোকুলার নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে ঝোঁপ জঙ্গলে পাখি দেখে বেড়াতাম। সেটা ১৯৯৫ সালের কথা। এরপর ভ্রমণের কোন সুযোগ পেলে ছাড়িনি কখনই। বাড়ি থেকেও অনেক স্বাধীনতা পেয়েছি শৈশবে। আমার একটা ফিনিক্স সাইকেল ছিল। বন্ধু হাসিবের ছিল র‌্যাংলার, দুজন মিলে মাইলের পর মাইল চষে বেড়িয়েছি সাইকেলে। ৩০-৩৫ কিলো সাইকেল চালিয়ে মাগুরা থেকে চলে গেছি মীর মোশাররফ হোসেনের কবর দেখতে রাজবাড়ির পদমদি গ্রামে। দুরন্ত শৈশব ছিলো আমার। ভ্রমণ ছিলো নেশার মত।

ক্লাস নাইনে যখন পড়ি তখন জ্বরের জন্য ডাক্তারের কাছে গেলে আমার শরীরে ধরা পড়লো অদ্ভূত এক রোগ। নাম বেকার মাসকুলার ডিসট্রফি। বাংলাদেশ আর ভারতের বহু ডাক্তার দেখিয়েও কোন ফল হলো না। শরীরে রোগের কোন উপসর্গ তখনো দেখা দেয়নি। ভারতের প্রখ্যাত নিউরোলজিস্ট ডাক্তার অভিজিৎ চ্যাটার্জী আমাকে ডেকে বললেন ‘যদিও তুমি এখনো অনেক বাচ্চা। তবু সত্যটা তোমাকে বলতেই হবে। তোমার শরীরের সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আস্তে আস্তে অকার্যকর হয়ে যাবে। প্রথমে আক্রান্ত হয়েছে তোমার পা, এখনো কোন উপসর্গ দেখা না দিলেও আস্তে আস্তে তোমার পায়ের শক্তি কমে যাবে, তুমি আগামী ১০ বছর পর সম্পূর্ণ পঙ্গু হয়ে যাবা, তারপর শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়াবে এটা। ঘটনাটা খুব ধীরে ধীরে ঘটবে। পৃথিবীর কোথাও এর কোন চিকিৎসা নেই। মানসিকভাবে তোমাকে প্রচণ্ড শক্ত হতে হবে।’ আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। আমি পুরো একটা বছর অস্বাভাবিকের মতো ছিলাম। তারপর কোথা থেকে যেন প্রবল শক্তি পেলাম মনে। আমি পণ করলাম আমি আমার এই অসুখের সাথে যুদ্ধ করবো। পঙ্গুত্বকে মানসিক শক্তি দিয়ে ঠেকিয়ে রাখবো যতদিন পারি। আর পঙ্গু হবার আগেই সমগ্র বাংলাদেশ ঘুরে দেখবো। শুরু হলো নতুন করে জীবনকে উদযাপন। ক্রিকেট খেলা, ফুটবল খেলা, সাইক্লিং, মোটর বাইকিং, নদীতে সাঁতার কাটা, ভ্রমণ, লেখালেখি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সব বাড়িয়ে দিলাম কয়েকগুণ। কলেজ পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুদের নিয়ে একটা ভ্রমণ দল গঠন করলাম, নাম দিলাম যাযাবর, সময় সুযোগ পেলে টাকা পয়সা জমিয়ে আমরা যাযাবর টিম ছুটে যেতাম দেশের নানা প্রান্তে।

২০০৬ সালের কথা বলছি। তখন বাংলাদেশে এখনকার মতো এত অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষ ছিলো না। পর্যটন শিল্পের অবস্থাও এতো ভালো ছিলো না। আমাদের মত ভ্রমণ টিম ছিলো হাতে গোনা দুয়েকটা। ভ্রমণ করতে গিয়ে হাজার রকমের অভিজ্ঞতা হয়েছে, বলে শেষ করা যাবেনা। কয়েকটা বই লেখা যাবে সেসব অভিজ্ঞতা নিয়ে। ভুল করে যেমন সীমান্ত অতিক্রম করে পাশের দেশে ঢুকে পড়ে ভয়াবহ বিপদে পড়তে গিয়ে অল্পের জন্য বেঁচেছি, তেমনি অচেনা গ্রামে অপরিচিত অতিথি হয়ে মানুষের বাড়ি রাত যাপন করেও পেয়েছি আন্তরিক আতিথিয়েতা। সুযোগ হলে সেসব অভিজ্ঞতা অন্য কোথাও অন্যকোন সময় বলবো। যাই হোক ডাক্তার বলেছিলেন ১০ বছর পর সম্পূর্ণ পঙ্গু হয়ে যাবো। সে হিসেবে ২০০৯ সাল থেকে আমার হুইল চেয়ার ব্যবহার করার কথা। আমি যুদ্ধ করে সেটাকে আরো প্রায় ৮ বছর বাড়িয়েছি। ২০১৬ সালের শেষ দিকে আমি হুইল চেয়ার নিতে বাধ্য হয়েছি। ভ্রমণের নেশা ছাড়তে পারিনি। হুইল চেয়ার সঙ্গে করেই গত ১২ এপ্রিল আবার বেড়িয়েছিলাম ভ্রমণে। ৮ দিনের সফরে গোপালগঞ্জ, বরিশাল ও কুয়াকাটা ঘুরে এলাম। দুর্গাসাগর, গুঠিয়া মসজিদ, চাখারের শেরে বাংলা জাদুঘর, জীবনানন্দ দাশের বাড়ি (বাড়িটা আসলে নেই, আছে একটা গ্রন্থাগার আর মিলনায়তন), বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, লাকুটিয়া জমিদার বাড়ি, কীর্তনখোলা নদী, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় কবি সুকান্তের বাড়ি, টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধি কমপ্লেক্স, মধুমতি নদী, কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, গঙ্গামতি, লেম্বুরচরসহ অনেক জায়গায় ঘুরলাম। আমার স্ত্রী, ছোটভাই, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো ৩ জন কাছের ছোটভাই ছিল আমার সফর সঙ্গী। ওদের সাহায্য ছাড়া এ ভ্রমণ সম্ভব ছিলোনা। কুয়াকাটায় এর আগেও দুবার গিয়েছি। তখন পায়ে হেঁটে গেছিলাম। আর এবার হুইল চেয়ারে। বালিয়াড়ি ঠেলে হুইল চেয়ার নিয়ে সমুদ্র ছুঁতে পারাটা বেশ সংগ্রামের। সে সংগ্রাম করতে আপত্তি নেই। কিন্তু দুঃখ পাই একটা কথা ভেবে যে, বাংলাদেশের কোন পর্যটন স্পট, রেস্ট হাউজ, হোটেল, যানবাহন কোন কিছুই শারীরিকভাবে অসুবিধাগ্রস্থদের জন্য প্রবেশগম্য নয়। বিষযটা নিয়ে কেউ হয়তো ওভাবে ভাবেও না। সমাজের ধারণা প্রতিবন্ধীদের আবার ট্রাভেলিং কিসের? পৃথিবীর বহুদেশে অধিকাংশ পর্যটন এলাকা প্রতিবন্ধিদের জন্য গমন যোগ্য। যাই হোক আমি সম্ভব সকল পর্যটন স্পটকে প্রতিবন্ধী বান্ধব করার আহ্বান জানাচ্ছি সরকার ও এ শিল্প সংশ্লিষ্ট সকলকে। আমি নিজেও এ বিষয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলবো। আশা করি বাংলাদেশের সকল ভ্রমণপ্রিয় মানুষকে সে আন্দোলনে পাশে পাবো। হুইল চেয়ারে বসার আগে আমি বাংলাদেশ ভ্রমণ শেষ করতে পারিনি। ৫৪টি জেলা শেষ করেছি। আরো ১০টি বাকি। সেগুলিও শেষ করবো। আর ভ্রমণ থামবে না। পায়ের উপর ভর করে যে ভ্রমণের শুরু তা এখন চলছে হুইল চেয়ারে। অ্যাম্বুলেন্স বা স্ট্রেচারে গিয়েও সে ভ্রমন চলবে। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ডাক্তার আমাকে বলেছেন আমার আয়ু চিকিৎসাশাস্ত্র অনুযায়ী আর ৫ বছর। আমি বলেছি বাহ্ অনেক সময়। আরো কিছু জায়গা ঘোরা যাবে। একটা সুপ্ত ইচ্ছে আছে, জানিনা পূরণ হবে কিনা। সুযোগ পেলে মরার আগে হুইলচেয়ারে বিশ্বভ্রমণ করবো। জয় হোক সকল ট্রাভেলারের। ( পোস্টটি অপ্রাসঙ্গিক বা গ্রুপ এর নীতি বিরুদ্ধ হলে, সম্মানিত এডমিনগন অ্যাপ্রুভ না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন )’

Loading...