নতুন এক রোগের নাম চিকুনগুনিয়া! এই রোগ সম্পর্কে যা জানা দরকার

অনেক রোগীই অভিযোগ করছেন, তাদের ভাইরাস জ্বর বা ডেঙ্গু জ্বর হয়েছিল, তবে জ্বর সেরে গেলেও শরীরটা একেবারেই ভালো যাচ্ছে না

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ এই রোগের নাম আমরা আগে কখনও শুনিনি। তেমনই এক নতুন রোগের নাম চিকুনগুনিয়া! কী এই চিকুনগুনিয়া রোগ?

সম্প্রতি অনেক রোগীই অভিযোগ করছেন, তাদের ভাইরাস জ্বর বা ডেঙ্গু জ্বর হয়েছিল, তবে জ্বর সেরে গেলেও শরীরটা একেবারেই ভালো যাচ্ছে না। সাধারণত যেকোনো ভাইরাস কিংবা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগী ৭ হতে ১০ দিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যান। অথচ বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে জ্বর ছেড়ে গেলেও রোগী আরও কিছুদিন অসুস্থ এবং দুর্বলবোধ করছেন, বিশেষ করে শরীরের গিঁটে গিঁটে ব্যথা কিছুতেই যাচ্ছে না। আবার দুর্বলতা-ক্লান্তিও কাটছে না। এটিকে ডেঙ্গু হিসেবে সন্দেহ করা হলেও এই রোগটি সম্ভবত ডেঙ্গু জ্বর নয়; বরং অন্য একটি ভাইরাসজনিত রোগ এটি, যাকে বলা হচ্ছে চিকুনগুনিয়া রোগ!

চিকুনগুনিয়া আসলে কী?

চিকুনগুনিয়া রোগটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আমাদের অতি পরিচিত ডেঙ্গুর সঙ্গে এর অনেকখানি মিল পাওয়া যায়। ডেঙ্গু জ্বরের মতোই এই ভাইরাসটি এডিস ইজিপ্টাই এবং এডিস অ্যালবপ্টিকাস মশার কামড়ের মাধ্যমে মানব শরীরে প্রবেশ করে থাকে। চিকুনগুনিয়া মানবদেহ হতে মশা এবং মশা হতে মানবদেহে ছড়িয়ে থাকে। মানুষ ছাড়াও বানর, পাখি, তীক্ষ্ণ দন্ত প্রাণী যেমন ইঁদুরে এই ভাইরাসের জীবনচক্র বিদ্যমান বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

চিকুনগুনিয়া রোগের লক্ষণ

চিকুনগুনিয়ার মূল উপসর্গ হলো জ্বর ও অস্থিসন্ধির ব্যথা। শরীরের তাপমাত্রা অনেকটা বেড়ে প্রায়ই ১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে যেতে পারে। তবে কাঁপুনি কিংবা ঘাম দেয় না। জ্বরের সঙ্গে সঙ্গে মাথাব্যথা, চোখ জ্বালা, গায়ে লাল লাল দানার মতো র্যাশ, অবসাদ, অনিদ্রা, বমি বমি ভাব ইত্যাদি নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। এমনকি শরীর ফুলেও যেতে পারে। এ ছাড়াও তীব্র অবসাদ, পেশিতে ব্যথা, অস্থিসন্ধির ব্যথা ইত্যাদি জ্বর চলে যাওয়ার পরও কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাসের পর মাসও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা বা প্রদাহ থাকতে পারে; যা অনেক ক্ষেত্রেই রোগীকে স্বাভাবিক কাজ-কর্ম করতে অক্ষম করে তোলে। রোগী ব্যথায় এতোই কাতর হয়ে পড়েন যে হাঁটতে কষ্ট হয়, সামনে বেঁকে হাঁটেন রোগী।

কীভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়

চিকুনগুনিয়া রোগের সন্দেহ হলে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে তা নিশ্চিত হওয়া যায়। এক্ষেত্রে রোগীর রক্তে ভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হয়। এতে ২ হতে ১২ দিন লাগতে পারে।

চিকুনগুনিয়া রোগের চিকিৎসা

অন্যান্য ভাইরাস জ্বরের মতোই এই রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা আপাতত নেই। এর চিকিৎসা মূলত এই রোগের উপসর্গগুলো নিরাময় করা। রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে ও প্রচুর পানি বা অন্যান্য তরল খেতে দিতে হবে। জ্বরের জন্য কেবলমাত্র প্যারাসিটামলজাতীয় ওষুধই যথেষ্ট। এর সঙ্গে সঙ্গে পানি দিয়ে শরীর স্পন্স (মুছিয়ে) দিতে হবে। তীব্র ব্যথার জন্য অন্য ভালো কোনো ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তা খেতে হবে। রোগীকে আবার যেনো মশা না কামড়ায় সেজন্য তাঁকে মশারির ভেতরে রাখাই উত্তম। কারণ হলো আক্রান্ত রোগীকে মশা কামড় দিয়ে কোনো সুস্থ লোককে সেই মশা কামড়ালে ওই ব্যক্তিও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।

চিকুনগুনিয়া রোগের প্রতিরোধ

চিকুনগুনিয়া জ্বরের কোনো প্রতিষেধক এখনও নেই। কোনো ভ্যাকসিন বা টিকাও বের হয়নি। তাই রোগ হতে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো এডিস মশা প্রতিরোধ। এডিস মশার উৎপত্তি স্থল ধ্বংস করা ও মশা নির্মূল করাই এর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। বাসাবাড়ির আশপাশে যেখানে পানি জমে থাকতে পারে, এমন স্থান সরিয়ে ফেলতে হবে ও নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। ডাবের খোসা, কোমল পানীয়ের ক্যান, ফুলের টব- এসব স্থানে যাতে পানি জমে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন। দরজা-জানালায় নেট লাগানো, ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করতে হবে। জেনে রাখা ভালো, এডিস মশা মূলত দিনের বেলা ও ঘরের বাইরেই বেশি কামড়ায়।

চিকুনগুনিয়া সম্পর্কে আরও তথ্য

# চিকুনগুনিয়া রোগটি এডিস মশার কামড় হতেই হয়। তাই মশা হতে দূরে থাকতে হবে।

# সন্তানরা মায়ের দুধ পান করলে সাধারণত চিকুনগুনিয়া রোগ হয় না। তাই আক্রান্ত মায়েদের চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

# চিকুনগুনিয়া রোগ হয়েছে এটা বোঝার প্রথম উপায় হলো জ্বর, মাথায় যন্ত্রণা, সারা শরীরে ব্যথা এবং গিরায় গিরায় খুব বেশি ব্যথা হওয়া। ডেঙ্গুর মতোই গায়ে অ্যালার্জি কিংবা ঘামাচির মতো র্যাশ হতে পারে। তবে রক্তক্ষরণ হয় না, এমনকি রক্তের প্লাটিলেটও কমে না।

ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ, ডিন, মেডিসিন অনুষদ, অধ্যাপক মেডিসিন বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখা এই প্রতিবেদনটি https://www.platform-med.org এর সৌজন্যে প্রাপ্ত।

মাধ্যমে Platform-med.org
Loading...