এক হিন্দু পরিবারের নামাজ-রোজা ও মসজিদ প্রীতি!

এই যুবকের এমন কাণ্ড দেখে ঠাট্টা করতে ছাড়ে না তার বন্ধুরা। তাকে মজা করে ডাকে, ‘মহম্মদ’ পার্থসারথি বসু!

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ নামাজ- রোজা করেন মুসলিমরা। কখনও কী শুনেছেন যে কোনো হিন্দু পরিবার নামাজ-রোজা করেন? তবে এবার সত্যিই এমন ঘটনা ঘটেছে ভারতে!

কোলকাতার প্রভাবশালী পত্রিকা আনন্দবাজার পত্রিকার এক খবরে বলা হয়েছে, মাস দেড়েক আগে জ্যাঠামশাই মারা যাওয়ায় হিন্দু নিয়ম অনুযায়ী ন্যাড়া হয়েছিলেন তিনি। সবে ছোট ছোট চুল উঁকি দিচ্ছে তার মাথায়। বড়সড় একটা রুমাল মাথায় বেঁধে মসজিদের ছাদটায় রোজাদারদের কাতারে ইফতারে বসেছেন পার্থ বসু। চল্লিশ বছর বয়সের এই যুবকের এমন কাণ্ড দেখে ঠাট্টা করতে ছাড়ে না তার বন্ধুরা। তাকে মজা করে ডাকে, ‘মহম্মদ’ পার্থসারথি বসু! পার্থর তাতে কিছু যায় আসে না। দিনভর উপবাস অর্থাৎ রোজা রাখেন, মোবাইলে নিষ্ঠাভরে টাইম মিলিয়ে খেজুরটা-কলাসহ নানা রকম ইফতারি মুখে দিয়ে পিত্তরক্ষা করেন।

কোলকাতার বারাসাত ডাকবাংলোর মোড় হতে মিনিট দশেকের পথ। আশপাশে এক ঘর মুসলিমেরও বসবাস নেই এই মহল্লায়। কয়েক কিলোমিটার দূরে মধ্যমগ্রামের কোঁড়া, চন্দনপুর, কাটুরিয়া এবং মছপুল হতে আসেন রোজাদারের দল।

বারাসাতে পশ্চিম ইছাপুর নবপল্লির এই মসজিদটাই ধ্যানজ্ঞান বোসবাড়ির ছেলেটির। এই তল্লাটে ২০-২৫ বিঘা জমি জুড়ে বোসেদের বিষয়-আশয়। আজকের বুড়ো কর্তা দীপক বসু কালীপূজায় বাড়িতে উপস করে থাকেন। তবে এই ৬৭ বছরেও রোজ সকাল-বিকেল মসজিদে হাজির হওয়া চাই তার।

সকাল ৭টায় নিজের হাতে মসজিদের মেঝে ঝাড়পোঁছ করেন তিনি, আর তাতেই তার শান্তি। এই বয়সে নিজে রোজা রাখতে পারেন না তবে তার ছেলে পার্থ ওরফে ‘বাপ্পা’র ফাঁকির উপায় নেই।

‘ওরা সারাদিন পানি স্পর্শ না করে রয়েছে, আমি কী করে খাই!’ কয়েক বছর হলো পার্থও রোজা রাখতে শুরু করেছে।

স্বামীর খেয়ালটুকুর মর্যাদা দিতে গিয়ে ভোরে সেহ্‌রির আগে চা-রুটি করে দিতে রাত দুটোয় ঘুম হতে উঠছেন পার্থর স্ত্রী পাপিয়া। গত বছর রমজানের সময় ব্যবসার কাজে বেশ কিছুদিন হৃষিকেশে ছিলেন পার্থ। পবিত্র হিন্দু তীর্থেও রোজার রুটিনে নড়চড় হয়নি তার।

বারাসাতে দেশান্তরী বাংলাদেশের খুলনার বসু পরিবার অবশ্য কখনও কল্পনাও করেনি তাদের ভাগ্যের সঙ্গে ঠিক এভাবেই জড়িয়ে যাবে একটি মসজিদ।

১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের দাঙ্গার পূর্বে কোনোদিন ‘ইন্ডিয়ায় থিতু হবো’ ভাবেনইনি কেও। পার্থর ঠাকুরদা প্রয়াত শ্রী নীরদকৃষ্ণ বসু পাক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের হাতের ‘খিদমত-ই-পাকিস্তান’ খেতাবধারী।

তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের গেজেটেড অফিসার ছিলেন। খুলনার ফুলতলার আলকা গ্রামের বোসদের জীবনে গভীর ঘা রেখে যায় তখনকার ঘটনা। রাজাকারদের হাত হতে বাঁচতে টানা ১১ দিন দফায় দফায় পুকুরে ডুব দিয়ে মুখটুকু তুলে লুকিয়ে ছিলেন এই বাড়ির ছেলে মৃণালকান্তি।

নীরদকৃষ্ণের সেজো ছেলে নারায়ণ কৃষ্ণকে একাত্তরে ধরে নিয়ে গিয়েছিল রাজাকাররা। তাকে হত্যা করে ওরা ফের চড়াও হবে ভেবে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন তার স্ত্রী গৌরী। নীরদকৃষ্ণ এবং তার ভাই বিনোদবিহারীর সন্তানরা এরপরই বারাসাতের ওয়াজুদ্দিন মোড়লের বিশাল সম্পত্তি পালটাপালটি করে শেষ পর্যন্ত তারা ভারতে চলে যান।

যে জমির মালিকানা তাদের মিলেছে, তাতে যে একখানা মসজিদ রয়েছে তা অবশ্য প্রথমে কেওই খেয়াল করেনি। সে সময় জমির পর্চাতেও কিছু লেখা ছিল না। মেরেকেটে সর্বমোট তিন কাঠা জায়গা মিলেছে। ভাঙাচোরা পোড়ো মসজিদটা কবেকার মধ্যযুগের তা বলতে পারেনা কেও।

সাপখোপের ভয়ে কেও ভেতরেও ঢুকতো না তখন। ‘ও রাখা না-রাখা সমান’ এমন কথা বলে মাথা ঘামাতেই চাননি সাবেক মুসলিম মালিকরা। তবে বাদামগাছের ধারের মসজিদে ভক্তি ভরে বাতি জ্বেলে নীরদকৃষ্ণের স্ত্রী লীলাবতীর মনটাই অন্য রকম হয়ে গেছে। ‘এই মসজিদে বাতিধূপের যেনো কোনো অভাব না হয় বাবা,’ ছেলেদের বলেছিলেন তিনি।

গুটিকয়েক রাজাকারের অত্যাচারের জন্য ধর্ম এবং তার মানুষদের দোষ দিতে পারবো না। কিছু মানুষের বিশ্বাসের স্মারক ধর্মস্থানের অমর্যাদা হতে দেওয়াও তো সম্ভব না! — এটিই ছিল নীরদকৃষ্ণের জীবনদর্শন।

বোসেদের হাতে মসজিদ সত্যিই নতুন প্রাণ পেলো। নিজেরা কখনও ধর্ম পাল্টানোর কথা ভাবেননি তারা। বিশ্বাসী হিন্দু পরিবার নিজের ধর্মাচরণ বজায় রেখেছেন যথাযথভাবে। শুধু ক্ষুদ্রতাকে কখনও প্রশ্রয় দেননি তারা।

‘লোক দেখানো বাড়াবাড়ি আমি মানি না। এটুকুই বুঝি, একসঙ্গে জড়িয়ে বাঁচায় কোনো সমস্যা নেই!’— এ কথা বলে স্মিত হাসেন পার্থর বাবা দীপকবাবু। সাধ্যমত মসজিদ সংস্কারের পথে হেঁটেছেন বসুরা।

ওই মসজিদের গায়ে বড় হরফে লেখা রয়েছে, ‘প্রভুকে প্রণাম করো’! তার পাশে লেখা, ‘আমানতি মসজিদ’। এই বসু পরিবার আবার চট্টগ্রামের হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলের ভক্তির পীরবাবা আমানত আলি শাহের মুরিদও। তারই নামে হুজুরঘরও গড়ে উঠেছে। বসুদের পারিবারিক সংস্কৃতির সঙ্গেও ক্রমশ একাকার হয়ে গেছে এই মসজিদ।

শুধু কী তাই! এই বাড়ির কেও মারা গেলে, তাকে একবার নিয়ে আসা হবে এখানে। শ্মশানে শেষযাত্রার পূর্বে আজান দেবেন ইমাম সাহেব। আবার আরও নিয়ম রয়েছে বিয়ের পর নতুন বউকেও প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি ঢোকার পূর্বে মসজিদে আসতে হবে।

এই বাড়িতে নবজাতকের অন্নপ্রাশনের কোনো দস্তুর নেই। তার পরিবর্তে মসজিদে ইমাম সাহেবের হাতে একটু পায়েস মুখে দেওয়ার রীতি প্রচলিত রয়েছে! সাম্প্রদায়িক ঘৃণা এবং বিদ্বেষের উসকানির কাছে হার না-মানা পারিবারিক মূল্যবোধেরও এক আমানত এই মসজিদ প্রাঙ্গণ।

আড়াই দশক পূর্বে অযোধ্যার বাবরি মসজিদ নিয়ে যখন তোলপাড় পুরো ভারত। নিঃশব্দে উলটো পথে হাঁটছিল এই মফস্বল মহল্লা। টালির চাল, বাঁশে ঘেরা মসজিদ আবার চাঙ্গা করে তুলতেই নতুন করে ইটের গাঁথনি বসছিল ঠিক তখনই।

পার্থ এবং তার জেঠতুতো দাদা-ভাইরা ভরসন্ধেবেলায় দল বেঁধে মসজিদেই পড়ে থেকে পাহারা দিতেন। বাপ-জ্যাঠাদের কড়া আদেশ, তাদের এই পারিবারিক মসজিদটিতে যেনো কোনো আঁচড় না পড়ে!

বলা বাহুল্য, সত্যি কোনো আঁচড় পড়েনি। এমন জাগ্রত মসজিদের কোনো ক্ষতি প্রাণে ধরে কেইবা হতে দেবেন! পাড়াপড়শি সকলের বিশ্বাস, এই মসজিদই তাদের রক্ষাকর্তা।

রাজনীতির ঝড় বাদলের কোনো ছাপও ফেলতে পারেনি। দীপকবাবু একজন কেরোসিনের ডিলার। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যৎসামান্য টাকা রেখে এখনও বারো আনাই উজাড় করেন মসজিদের যত্নে।

এই বোসবাড়ির ছেলেই বম্বের প্রয়াত ফিল্ম ডিরেক্টর দিলীপকুমার বসু। বংশের অন্যান্য ভাইরা মিলে ভাগাভাগি করে মসজিদের চেহারা ফিরিয়েছেন তারা। ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ডেকে এনে বসানো হয়েছে। আবার সঙ্কটে-সমস্যায় হিন্দুরাও আসেন এখানে। তবে কবচ-তাবিজ বিক্রির কোনো প্রশ্নই নেই।

জোর গলায় দীপকবাবু বলেছেন, ‘বিশ্বাস বিশ্বাসের জায়গায় থাকুক! ধর্মব্যবসা কখনও হতে দেনো না’। অনেক বছর পূর্বে তাবিজ-মাদুলি বিক্রির অপরাধে এক ইমামকে বরখাস্তও করেছিলেন বসুরা। বহিষ্কৃত ইমাম পালটা ঘোঁট পাকাতে গেলে ‘বোসবাড়ির মসজিদ’ শুনে কেও সে অভিযোগ আমলই দেননি।

কেও যাতে আঙুল তুলতে না পারে, তাই এই মসজিদে নগদ অনুদান গ্রহণেরও কোনো নিয়ম নেই। নানা ব্যবসায় জড়িত থাকলেও স্থানীয় মুসলিমদের জমিতে হাত দিতে হতে পারে ভেবে সব সময় প্রোমোটারি এড়িয়ে চলেন বসু পরিবার।

এক প্রভাবশালী ধর্মীয় সংগঠনের তরফ থেকে একবার মসজিদের দায়ভার কাঁধে নেওয়ার প্রস্তাব আসে। বসুরা তাদের বসিয়ে চা-নাস্তা খাইয়েছেন। আর বলেছেন, ‘এই প্রাণের মসজিদ কী করে ছেড়ে থাকবো’— এভাবেই সবিনয় নিজেদের অপারগতাটুকু বুঝিয়েছেন তারা।

আবার ইফতারেও রাজনীতির ছোঁয়াচ লাগার কোনো উপায় নেই। কোনো নেতানেত্রীকেই ডাকা হয় না। ‘ইফতার-পার্টি’ শব্দটাতেই যেনো ঘোরতর অ্যালার্জি পার্থর। তাদের বক্তব্য হলো, ‘ইফতারের আবার পার্টি কী? এখানকার রোজাদারদেরও জাঁকজমক ভরা মোচ্ছব এড়িয়ে চলতেই অনুরোধ করা হয় সব সময়!’

কিন্তু তাতে কী, ইফতারের সময় যেনো আনন্দের এক হাট বয়ে যায়। সন্ধ্যায় ইমামের কোরআন পাঠের আসরে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে ভিড় বসে সকলের। পার্থ বলেছেন, ‘আমরা মানি, কোরআন তবে শুধু মুসলিম নয়, সবার পড়ার জন্য!’

সাতাশের রোজার দিন কোরআন খতম সম্পূর্ণ হলে সাধ্যমত চাঁদা তুলে পাড়ার সবাইকে মাছ-ভাত খাওয়ান নিয়মিত রোজাদাররা। বিকেলে ইমাম আখতার আলী আসেন মোটরসাইকেল করে। সন্ধ্যায় তারাবির নামাজ শুরুর পূর্বে মসজিদে বসে এক প্রস্থ মাছ-ভাত খেয়ে ওঠেন। তবে পিতৃপ্রতিম দীপকবাবু আশপাশে থাকলে, তার মুশকিল হয়ে পড়ে। কারণ এক টিপ খইনি মুখে দিতেও আখতার ভাইকে আড়াল খুঁজতে হয়। ধরা পড়লেই বকুনি খেতে হবে। কারণ হলো সবার গার্জেন দীপকবাবুর স্নেহের শাসন জারি থাকে সর্বক্ষণ।

সত্যিই এক অন্য রকম অনুভূতি তৈরি করে এদের মন-মানষিকতা। ধর্ম এবং ধর্মের মূল্যবোধ মানুষকে কি দিতে পারে তা একমাত্র এই বোস পরিবারকে দেখলেই বোঝা যায়। ধর্ম এবং রাজনীতি যে সম্পূর্ণ পৃথক একটি জিনিস তা বোঝা যায় বারাসাতের অখ্যাত মহল্লায় তিন কাঠার জমির ভারতবর্ষ কাহিনীটি। ‘একসঙ্গে বাঁচবই’ আর মানুষের ধর্ম ও বর্ণ এর মধ্যে যে কোনো পার্থক্য নেই তাও প্রমাণ করেছেন এই বোস পরিবার! মিলে-মিশে থেকে যে অনেক কিছু করা যায় সেটিও গোড়ামোকারীদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন এই বোস পরিবার।

Advertisements
Loading...