অফিসের আইন: মোটা হলেই বেতন কম!

রাশিয়ার জাতীয় বিমান পরিবহন সংস্থা অ্যারোফ্লোট এমন এক ব্যবস্থা নিয়ে শেষ পর্যন্ত বেকায়দায়

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ চাকরি করতে হলে বেশ কিছু নিয়ম মানতে হয়। যেমন সঠিক সময় অফিসে যাওয়া, মনোযোগ দিয়ে কাজ করা। অফিস বা কর্তৃপক্ষ যে টার্গেট দেয় সেগুলো ফুলফিল করা। কিন্তু এমন শর্ত বা আইনের কথা আগে কখনও শোনা যায়নি। শর্ত হলো পাতলা থাকতে হবে, মোটা হলেই বেতন কম!

মোটা হলেই বেতন কম, পাতলা-সাতলা হলে বেতন বেশি- ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে রাশিয়ার জাতীয় বিমান পরিবহন সংস্থা অ্যারোফ্লোট এমন এক ব্যবস্থা নিয়ে শেষ পর্যন্ত বেকায়দায় পড়েছে। এখন নিজেদের সুনাম নিয়ে টানাটানি লেগে গেছে। যাত্রী সেবিকাদের শারীরিক আকারের ভিত্তিতে বেতন এবং বোনাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অ্যারোফ্লোট কর্তৃপক্ষ। এই নীতি অনুযায়ী সবচেয়ে পাতলা গড়নের সেবিকারা পেতেন বেশি বেতন।

মোটা হলেই বেতন কম, এই বিষয়টি নিয়ে কর্মীদের মধ্যে বৈষম্য করার অভিযোগ উঠেছে অ্যারোফ্লোট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। যদিও প্রতিষ্ঠানটি এই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছে।

এই বৈষম্য নিয়ে প্রথম মুখ খোলেন ইভগেনিয়া ম্যাগুরিনা নামে এক কর্মী। তিনি অ্যারোফ্লোটের একজন যাত্রী সেবিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত বছর তিনিসহ প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করা সব কেবিন ক্রুদের ছবি তোলেন কর্তৃপক্ষ। গত বছর অক্টোবর হতে ইভগেনিয়া বুঝতে পারেন যে, তার বোনাসের পরিমাণ কমে গেছে। তাকে আকর্ষণীয় এবং দীর্ঘ যাত্রার ফ্লাইটগুলোর দায়িত্ব হতেও সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন ইভগেনিয়া। তখন তাকে বলা হয়, কাঙ্ক্ষিত শারীরিক গঠনের সঙ্গে সংগতি না থাকার কারণে তার বেতন কমানো হয়েছে। অ্যারোফ্লোট কর্তৃপক্ষ ঠিক করেছে, কোনো অবস্থাতেই কেবিন ক্রুদের পোশাকের মাপ রাশিয়ার মানদণ্ড অনুযায়ী ৪৮-এর বেশি হতে পারবে না। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এল বা লার্জ সাইজের পোশাক।

ইভগেনিয়া বলেছেন, ‘আমি প্রথমে মানসিকভাবে প্রচণ্ড ধাক্কা খাই। এর কি কোনো মানে থাকতে পারে? কীভাবে তারা শারীরিক কাঠামো অনুযায়ী একজনের বেতন নির্ধারণ করে? বিমান পরিবহন সংস্থায় আমি প্রায় ৭ বছর ধরে কাজ করছি। কোনো দিন এমনটি দেখিনি। কর্তৃপক্ষ বলছে, যাত্রী সেবিকার সাফল্য নির্ভর করে তার শারীরিক কাঠামোর ওপর!’

ইভগেনিয়ার দাবি হলো, আরও শতাধিক কেবিন ক্রু একই সমস্যার সম্মুখিন হচ্ছেন। সে কারণে তাদের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে কাজ করানো হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের ফ্লাইটে এসব কর্মীকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যেনো তাদের কেও দেখতে না পায়! কারণ হলো রাতের ফ্লাইটে বেশির ভাগ যাত্রীই ঘুমিয়ে থাকেন।

শুধু ইভগেনিয়া নন, রাশিয়ায় আরও অনেক পেশাতে বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন নারীরা। অথচ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের এই দেশে নারীদেরই বেশি অধিকার থাকার কথা। ১৯১৭ সালে রাশিয়ার নারীরা ভোটাধিকার পেয়েছিলেন। এর কিছুদিন পরই গর্ভপাতও বৈধ করা হয়ক দেশটিতে। এমনকি বিশ্বের প্রথম নারী মহাকাশচারীও পাঠিয়েছিল তৎকালীন এই সোভিয়েত রাশিয়া। ওই নারী হলেন ভ্যালেন্তিনা তেরেসকোভা। অথচ এই দেশেই এখন ৪৫৬টি পেশায় নারীদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা রয়েছে!

মোটা হওয়ার কারণে ইভগেনিয়া পূর্বের চেয়ে ৩০ শতাংশ বেতন কম পেয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে অ্যারোফ্লোটকে কাঠগড়ায় তুলেছেন তিনি। সম্প্রতি এই মামলার শুনানিও হয়েছে।

অ্যারোফ্লোটের আইনজীবীরা বলেছেন, ইভগেনিয়ার প্রতি কেজি বাড়তি ওজনের জন্য প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি খরচ বেশি হয়েছে! তারা এ কথাও বলেছেন, প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন উড়োজাহাজের সরু করিডরের কথা চিন্তা করেই যাত্রী সেবিকাদের পাতলা গড়ন থাকা প্রয়োজন। তাদের দাবি, এতে বৈষম্য করা হয়নি। তবে এসব অদ্ভুতুড়ে যুক্তিতে মোটেও কান দেননি বিচারক। তিনি প্রতিষ্ঠানটির এই নীতিমালাকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন।

এই রায় এর পর ইভগেনিয়ার চোখে আসে পানি। কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেছেন, ‘তারা ভেবেছিলেন আমরা এগুলো সহ্য করে যাবো। আশা করি, এই রায়ের পর নারীরা নিজেদের অধিকার নিয়ে লড়াই করার সাহস পাবেন।’

Advertisements
Loading...