The Dhaka Times
তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে রাখার প্রত্যয়ে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ম্যাগাজিন।

আপনি কীভাবে চিনবেন ‘ব্লু হোয়েল’ আসক্তদের? সাবধান হোন এই বিপদজনক গেম থেকে

সাম্প্রতিক সময় ইন্টারনেট দুনিয়ার এক ভয়ংকর নাম হলো ‘ব্লু হোয়েল’

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ গোটা বিশ্ব আজ ‘ব্লু হোয়েল’ নিয়ে চিন্তিত। তরুণ-তরুণীদের আসক্ত করে জীবন কেড়ে নেওয়া এই গেমটি কিভাবে আসলো এবং কে আনলো সেটি নিয়েই আজকের এই প্রতিবেদন।

সাম্প্রতিক সময় ইন্টারনেট দুনিয়ার এক ভয়ংকর নাম হলো ‘ব্লু হোয়েল’। এই সুইসাইড গেম বা মরণ নেশার ফাঁদে পড়ে তরুণ-তরুণীরা আত্মহত্যা করছে অকাতরে। এমন কী রয়েছে এই গেমের মধ্যে? ফিলিপ বুদেকিন নামে এক ব্যক্তি তৈরি করেছেন এই গেমটি। তিনি কেনোইবা তৈরি করলেন এই গেম, তাই এখন আলোচনার অন্যতম ইস্যু হলো এই ‘ব্লু হোয়েল’ গেম।

ফিলিপ বুদেকিন রাশিয়ার নাগরিক। তার ডাকনাম হলো ফিলিপ ফক্স। তার পরিবার সম্পর্কে বিস্তারিত কিছুই জানা যায়নি।

আপনি কীভাবে চিনবেন ‘ব্লু হোয়েল’ আসক্তদের? সাবধান হোন এই বিপদজনক গেম থেকে 1

জানা গেছে, ফিলিপ ১৮ বছর বয়সে ২০১৩ সালে প্রথম ব্লু হোয়েল নিয়ে কাজ শুরু করেন। প্রথমে তিনি সামাজিকমাধ্যমে ‘এফ৫৭’ নামে একটি গ্রুপও তৈরি করেন। তারপর ৫ বছরের জন্য একটি পরিকল্পনাও গ্রহণ করেন। ৫ বছরের মধ্যে যেসব মানুষ সমাজের জন্য অপ্রয়োজনীয় (তার ধারণা মতে) তাদের ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেন এই ফিলিপ।

ফিলিপ যখন এই পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেন তখনই তিনি রাশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করতেন। তিনি সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ও মনোবিজ্ঞান বিষয়ে পড়ালেখা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ বছর পড়াশোনার পর ব্লু হোয়েলের বিষয়টি প্রকাশ হলে ২০১৬ সালে তাকে বহিষ্কার করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ওই সময় তাকে গ্রেফতার করে রাশিয়ার আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী।

তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, কিশোর বয়সে ফিলিপ তার মা ও বড় ভাইয়ের হাতে প্রচুর নির্যাতনের শিকার হন। তবে সে নিজেও মানসিকভাবে অসুস্থ বলে তদন্তকারী কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

ফিলিপ এবং তার সহযোগীরা প্রথমে রাশিয়ার সামাজিকমাধ্যম ‘ভিকে’ ব্যবহার করে। সেখানে তারা একটি গ্রুপও করে। ওই গ্রুপে ভয়ের ভিডিও ছড়ানোর মাধ্যমে কাজ শুরু করে তারা।

ভয়ের ভিডিও ছড়ানোর কারণে ওই গ্রুপে প্রচুর তরুণ-তরুণী যুক্ত হয়েছে। এরপর সেখান থেকে বুদেকিনের সঙ্গীরা মিলে এমন তরুণ-তরুণীদের বাছাই করতে থাকে, যাদের সহজে ঘায়েল করা সম্ভব।

সেন্ট পিটার্সবার্গ নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফিলিপ বলেছেন, ‘যেখানে মানুষ আছে সেখানে কিছু জীবন্ত বর্জও (মানুষ) রয়েছে। ওইসব মানুষদের সমাজে কোনো প্রয়োজন নেই। তারা হয় নিজেরা সমাজের জন্য ক্ষতি, না হয় তারা সমাজের নানা ক্ষতির কারণ। আমি সমাজের ওইসব ‘বর্জ্য’ পরিষ্কার করতে চাই।’

অবশ্য তিনি সরাসরি আত্মহত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আমি আত্মহত্যার জন্য কখনও অনুপ্রাণিত করিনি। তবে গেমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা নিজেরাই আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।

এ বছর মে মাসে এক গোপন বিচারের মাধ্যমে ফিলিপকে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি সাইবেরিয়ার একটি কারাগারে কারাভোগ করছেন।

কীভাবে কাজ করে এই ‘ব্লু হোয়েল’ গেম ?

প্রকৃতি পক্ষে ‘ব্লু হোয়েল’ অনলাইনভিত্তিক একটি গেম। অনলাইনে একটি কমিউনিটি তৈরির মাধ্যমে চলে এই প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় সর্বমোট ৫০টি ধাপ রয়েছে। এই ধাপগুলো খেলার জন্য ওই কমিউনিটির অ্যাডমিন কিংবা পরিচালক খেলতে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ দিতে থাকে। তখন প্রতিযোগী সে চ্যালেঞ্জ পূরণ করে তার ছবি আপলোড করে। শুরুতে মোটামুটি সহজ ও কিছুটা চ্যালেঞ্জিং কাজ দেওয়া হয়। যেমন হলো, মধ্যরাতে ভূতের সিনেমা দেখা। খুব সকালে ছাদের কিনারা দিয়ে হেঁটে বেড়ানো এবং ব্লেড দিয়ে হাতে তিমির ছবি আঁকার মতো কাজগুলো।

কিন্তু ধাপ যতো বাড়তে থাকে ততোই চ্যালেঞ্জিং আরো বাড়তে থাকে এবং এক সময় কঠিন ও মারাত্মক সব চ্যালেঞ্জ দেয় পরিচালক। যেগুলো অত্যন্ত ভয়াবহ। এই খেলার সর্বশেষ ধাপ হলো আত্মহত্যা করা। অর্থাৎ গেম শেষ করতে হলে প্রতিযোগীকে অবশ্যই আত্মহত্যা করতে হবে। তবে এই গেমের শেষ ধাপে যাওয়ার পূর্বেই খেলোয়াড়ের মৃত্যু ঘটতে পারে। যেমন: ছাদের কিনারায় হাঁটা কিংবা রেললাইনে হাঁটার মতো যেসব কাজ করতে বলা হয় এই গেমে, ওইসব কাজ করার সময় মৃত্যুও হতে পারে।

গেমটির বেশিরভাগ ধাপই এমনভাবে সাজানো হয়েছে, ওইসব ধাপ অতিক্রম করতে করতেই খেলোয়াড়ের মৃত্যু ঘটতে পারে। ‘ব্লু হোয়েল’র কবলে পড়ে ৫০তম ধাপে গিয়ে যারা আত্মহত্যা করছে কেবল তাদের খবরই প্রকাশ পাচ্ছে। তবে এর পূর্বে যারা মারা যাচ্ছে তারা ‘ব্লু হোয়েল’ এর ফাঁদে পড়ে মারা যাচ্ছে কিনা- সেটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

কেনো এমনটিভাবে তরুণ-তরুণীরা আকৃষ্ট হয়?

‘ব্লু হোয়েল’ গেম এ সাধারণত অবসাদগ্রস্ত তরুণ-তরুণীরা আসক্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে গভীর রাতে কিংবা একাকী দীর্ঘ সময় যারা ইন্টারনেটে মাজিকমাধ্যম জগতে বিচরণ করে থাকে, মূলত তারাই এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া তরুণ-তরুণীদের মধ্যে নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার যে স্পৃহাতো রয়েছেই। সেটাকে কাজে লাগিয়ে ফাঁদে ফেলছে এর কিউরেটররা।

‘ব্লু হোয়েল’ গেম এ অংশগ্রহণকারীদের প্রথমে বলা হয় সাহসের প্রমাণ দিতে। সেজন্য তাদের ছোট ছোট কিছু সাহসী কাজ দিয়ে এগিয়ে নেওয়া হয়। একবার এতে জড়িয়ে পড়লে তখন সহসা বের হওয়ার সুযোগই থাকে না।

নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ও সাহস আছে কি না- এমন কথায় সাহস দেখাতে গিয়েই দিনকে দিন তরুণ-তরুণীরা আকৃষ্ট হচ্ছে এই গেমে। তবে একবার এই খেলায় ঢুকে পড়লে তা থেকে বের হয়ে আসা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।

‘ব্লু হোয়েল’ আসক্তদের কিভাবে চিনবেন?

যেসব কিশোর-কিশোরী ‘ব্লু হোয়েল’ গেমে আসক্ত হয়ে পড়ছে তারা সাধারণভাবে নিজেদের সব সময় লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। কোনো রকম স্বাভাবিক আচরণ তাদের মধ্যে দেখা যায় না। দিনের বেশিরভাগ সময় তারা কাটিয়ে দেয় সোশ্যাল মিডিয়াতে। সব সময় থাকে চুপচাপ। কখনও কখনও আবার আলাপ জমায় অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে। গভীর রাত অবধি ছাদে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় অনেককে। তারা একটা সময় পর নিজের শরীরকে ক্ষত-বিক্ষত করে তুলতে থাকে।

এই ‘ব্লু হোয়েল’ গেম থেকে বাঁচতে করণীয় কী?

এই মরণ ফাঁদ হতে বাঁচার জন্য মনোবিজ্ঞানীরা কিছু পরামর্শও দিচ্ছেন। সেগুলো হলো:

# প্রথমেই আপনাকে সচেতন হতে হবে। কেনো আপনি অপরের নির্দেশনায় কাজ করতে যাবে, সেটি মাথায় রাখতে হবে। আপনি যাকে কখনও দেখেননি, যার পরিচয়ও জানেন না, তার কথায় কেনো আপনি চলবেন বা তার কথামতো কেনো কাজ করবেন- সেটি নিজেকে ভালো করে চিন্তা করতে হবে।

# অপরিচিত বা বিদঘুটে কোনো লিংক সামনে এলে তাকে এড়িয়ে চলতে হবে।

# সমাজের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এই গেমের নেতিবাচক দিক সম্পর্কে প্রচারণা চালাতে হবে।

# সন্তান, ভাই-বোন কিংবা নিকটজনকে মোবাইলে এবং কম্পিউটারে অধিক সময় একাকী বসে থাকতে দেখলে সে কী করছে, তার খোঁজ নিতে হবে। সন্তানকে কখনওই একাকী বেশি সময় থাকতে না দেওয়া ও এসব গেমের কুফল সম্পর্কে বলতে হবে।

# সন্তানদের মাঝে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে। যাতে করে তারা আত্মহত্যা করা কিংবা নিজের শরীরকে ক্ষত-বিক্ষত করার মতো কাজগুলো যে বড় পাপ- এটা তাদের বুঝাতে হবে।

# সন্তান এবং পরিবারের অন্য কোনো সদস্য মানসিকভাবে বিপর্যস্ত রয়েছে কিনা- সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। কেও যদি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয় তাকে সঙ্গ দেওয়া দরকার।

# কৌতূহলি মন নিয়ে কখনওই এই গেমটি খেলার চেষ্টা না করা। কৌতূহল হতে এই খেলা নেশাতে পরিণত হয়। আর এই নেশাই হয়তো ডেকে আনতে পারে মৃত্যুও।

Loading...