এম. এইচ. সোহেল ॥ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইট শুরু হওয়ার পরপরই ঢাকা ও আশপাশের ভয়াবহ পরিস্থিতির খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই সময় মার্ক টালি ও তার বিবিসি টিম দিল্লি ও কলকাতা থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে ঢাকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে রিপোর্ট করেন।

২৫ মার্চের গণহত্যা ও সেনা অভিযান শুরুর খবর
তখন তিনি জানান-
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আবাসিক এলাকায় নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড ও বেসামরিক মানুষের ওপর সামরিক আগ্রাসন।
এই প্রতিবেদনগুলো পশ্চিমা শ্রোতাদের কাছে প্রথমবারের মতো স্পষ্ট করে দেয় যে, এটি কেবল “দাঙ্গা” নয়, বরং একটি সংগঠিত সামরিক গণহত্যা।
শরণার্থী সংকট: মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র
মার্ক টালির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কভারেজ ছিল ভারতে আশ্রয় নেওয়া কোটি কোটি বাংলাদেশি শরণার্থীর দুর্দশা।
তার রিপোর্টে উঠে আসে-
# নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের অনাহার ও রোগে ভোগা
# সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবন
# ভারতের ওপর ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ
এই প্রতিবেদনগুলোই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে (UN, Red Cross) দ্রুত সক্রিয় হতে বাধ্য করে ও যুদ্ধকে মানবিক সংকট হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃতিও দেয়।

মুক্তিবাহিনী ও প্রতিরোধ যুদ্ধের বাস্তবতা
পাকিস্তান সরকার মুক্তিবাহিনীকে “সন্ত্রাসী” হিসেবে প্রচার করলেও মার্ক টালির রিপোর্ট ছিল একেবারেই ভিন্ন।
তিনি তুলে ধরেন-
# সাধারণ কৃষক, ছাত্র ও শ্রমিকদের মুক্তিবাহিনীতে যোগদান
# গেরিলা যুদ্ধের কৌশল
# জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন
এর মাধ্যমে বিশ্ব বুঝতে পারে যে, এটি একটি জনযুদ্ধ, বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ নয়।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতা ও সেন্সরশিপ
মার্ক টালি বারবার তুলে ধরেন-
# পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সংবাদ দমন
# বিদেশি সাংবাদিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা
# তথ্য গোপনের চেষ্টা
এই বিশ্লেষণ আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে ও বাংলাদেশের দাবি আরও শক্তিশালী করে।
ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি
ডিসেম্বর ১৯৭১-এ ভারত যুদ্ধে সরাসরি যুক্ত হলে মার্ক টালি পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করেন কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে-
# কেনো ভারত যুদ্ধে নামতে বাধ্য হলো
# সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা
# জাতিসংঘের কূটনৈতিক টানাপোড়েন
তার বিশ্লেষণ যুদ্ধকে কেবল আঞ্চলিক নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতির অংশ হিসেবে তুলে ধরে।
১৬ ডিসেম্বর: বিজয় ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়
যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে টালির প্রতিবেদনে উঠে আসে-
# পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি
# ঢাকায় বিজয়ের আবহ
# একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম
বিবিসির মাধ্যমে বিশ্ব প্রথম স্পষ্টভাবে জানতে পারে যে- বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
মূল্যায়ন
মার্ক টালির মুক্তিযুদ্ধ কভারেজ ছিল-
# নিরপেক্ষ কিন্তু মানবিক
# তথ্যভিত্তিক কিন্তু সাহসী
# কণ্ঠনির্ভর সাংবাদিকতার এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিশ্বজনমত পেয়েছিল যার মাধ্যমে- তার পেছনে এই প্রতিবেদনগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। তাই গতকাল (২৫ জানুয়ারী) প্রয়াত এই অকুতভয় সাংবাদিকের প্রতি রইলো আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।
>>>>>>>>>>>>>>
ডেঙ্গু প্রতিরোধ করবেন যেভাবে
মশা বাহিত একপ্রকার ভাইরাস জ্বর হলো ডেঙ্গু। এই জ্বর অন্যান্য ভাইরাস কিংবা ব্যাকটেরিয়াজনিত জ্বর থেকে ভিন্ন। অবশ্য এই জ্বর কোনোভাবেই ছোঁয়াচে নয়। এই ভাইরাস জ্বর এককভাবে বা অন্যান্য ভাইরাস (চিকুনগুনিয়া, ইয়েলো ফিভার, বার্মা ফরেস্ট, ফ্লু, রেসপাইরেটরি সিনসাইটিয়াল) এবং ব্যাকটেরিয়া (নিউমোক্কাস)-এর সঙ্গেও হতে পারে।
লক্ষণ ও জ্বরের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে ডেঙ্গুজ্বরকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে-
১. সাধারণ ডেঙ্গুজ্বর
২. রক্তপাতসহ ডেঙ্গুজ্বর।
সাধারণ ডেঙ্গুজ্বরের ক্ষেত্রে চোখে পড়ে মূলত নিচের এই লক্ষণগুলো-
১. হঠাৎ করে তীব্র জ্বর ও তা ২ থেকে ৭ দিন স্থায়ী হওয়া।
২. তীব্র মাথাব্যথা হওয়া।
৩. চোখের পেছনের অংশে ব্যথা হওয়া।
৪. জ্বরের সঙ্গে সঙ্গে সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি চোখে পড়া।
৫. সম্পূর্ণ শরীরে তীব্র ব্যথা ও সেইসঙ্গে কোমরে ব্যথা।
৬. বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
৭. ত্বকে র্যাশ বা লাল দানা দানা দেখা দেওয়া।
রক্তপাতসহ ডেঙ্গুজ্বরের ক্ষেত্রে :
১. ২ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তীব্র জ্বর সঙ্গে নাক, মুখ বা বমির সঙ্গে রক্ত যাওয়া।
২. জ্বরের পাশাপাশি বুকে বা পেটে পানি জমে যাওয়া।
এইসব লক্ষণের যে কোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
অপরদিকে
জ্বরের প্রথম ৩ দিন বাড়িতে অপেক্ষা করুন। অপরদিকে সারা শরীর পানি দিয়ে স্পঞ্জ করুন কিছুক্ষণ পরপর। এতে করে জ্বরের মাত্রা কমে আসবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান ও বিশ্রাম নিতে হবে। এরপরেও জ্বর না কমলে বা কিছু সময় পরপর বাড়তে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় বিষয়:
১. বাড়ির আশপাশ যতোটা সম্ভব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে চেষ্টা করুন।
২. ঘরের ভেতরে থাকা ফুলের টব বা ভাঙা প্লাস্টিকের বোতল, ডাবের খোসা, টায়ার অথবা পলিথিন থাকলে তা দ্রুত পরিষ্কার করে ফেলুন ও ফুলের টব থেকে জমে থাকা পানি নিষ্কাশন করুন।
৩. মশা নিধনের জন্য সপ্তাহে অন্তত ৩ বার স্প্রে বা ফগিং করুন।
৪. বাড়ির বাইরে যাওয়ার সময় মশা নিধনে ব্যবহৃত ক্রিম সঙ্গে রাখতে পারেন।
৫. সন্ধ্যার পর বাড়ির ছোট থেকে বড় সদস্যরা মশারি ব্যবহার করুন।
৬. যেখানে-সেখানে জমে থাকা বৃষ্টির পানি পরিষ্কার করে ফেলুন, কারণ এতে এডিস মশা ডিম পেড়ে থাকে এই সময়।
৭. অপরদিকে মশার প্রকোপ থেকে বাঁচতে মশারির সঙ্গে সঙ্গে ম্যাট ব্যবহার করতে পারেন।
৮. এডিস মশা যেহেতু দিনের বেলা কামড়ায় তাই দিনের বেলায় ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি টানিয়ে ঘুমানোর দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সূত্র: https://dmpnews.org