অভিনেত্রী মিতা নূরের মৃত্যু ॥ রহস্যের জট এখনও খোলেনি

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ টিভি অভিনেত্রী মিতা নূরের মৃত্যুর রহস্য এখনও উন্মোচিত হয়নি। এই মৃত্যু নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উকি মারছে।

Mita Family

সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, মিতা নূরের পিতার দাবি, স্বামীর নির্যাতন সইতে না পেরেই মিতা আত্মহত্যা করেছে। মা বলছেন, মিতার মৃত্যুর পেছনে রহস্য আছে। কি সেই রহস্য সরজমিন দেখা গেছে, ড্রইং রুমের চারপাশে সোফাসেট। এর উচ্চতা প্রায় দুই ফুট। সেই সোফাসেটে দাঁড়িয়ে সহজেই সিলিং ফ্যানের নাগাল পাওয়া যায়। এছাড়া, রুমের দরজা ছিল ভেজানো। ভেতর থেকে খোলা ছিল ছিটকিনি। ওই রুম ছাড়া বাকি চার রুমেই লোকজনের উপস্থিতি ছিল। এমন পারিপার্শ্বিক অবস্থায় গতকাল সকাল পৌনে ৭টার দিকে ড্রইং রুমের একটি সিলিং ফ্যান থেকে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় ৪২ বছর বয়সী অভিনেত্রী মিতা নূরের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরিচিত এ তারকার আকস্মিক মৃত্যু নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। মিতা নূরের সহকর্মীরা এই মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলতে নারাজ।

Mita+Noor-4

মিতা নূরের পিতা ফজলুর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, স্বামীর নির্যাতন সইতে না পেরে আমার মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। মা মরিয়ম বেগম মেয়ের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলতে নারাজ। স্বামী শাহ নূর রহমান মজুমদারের দাবি, মৃত্যুর কারণ তিনি জানেন না। তবে ঘটনার কয়েক দিন আগে তার অফিসে ভাঙচুর চালিয়েছিল মিতা। পুলিশ ডেকে এনে মামলার ভয় দেখিয়েছিল। ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা জানান, মিতার মধ্যে কখনও আত্মহত্যা করার মতো প্রবণতা দেখতে পাননি তারা।

গুলশান থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, কিছু দিন ধরে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভাল যাচ্ছিল না। আমি নিজেই তাদের বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করেছি। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। তবে প্রাথমিকভাবে তার ধারণা, এটি আত্মহত্যা। গতকাল সকালে রাজধানীর গুলশান ২-এর ১০৪ নম্বর রোডের ১৬ নম্বর বাড়ি সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, বিশাল লেক ঘেঁষা বিলাসবহুল ভবনটির নাম ‘প্রাসাদ লেক ভ্যালী’, এ বাড়ির ষষ্ঠ তলার ফ্ল্যাটটি মিতা নূরের স্বামী শাহনূর রহমান মজুমদার ওরফে রানার নামে কেনা। সকাল থেকেই সেখানে ছিল মিতা নূর ও শাহনূর পরিবারের ঘনিষ্ঠ স্বজন, অভিনয় জগতের শিল্পী-কলাকুশলী এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ভিড়। লাশ ঘিরে আহাজারি করছিলেন মিতা নূরের মা মরিয়ম বেগম ও স্বজনরা। বিলাপ করে মরিয়ম বেগম বলছিলেন, তার মেয়ে আত্মহত্যা করতে পারে না। সে ছিল হাসি-খুশি। তার মধ্যে আত্মহত্যার কোন লক্ষণ ছিল না। হয়তো ওই পথে যেতে কেও বাধ্য করেছে। তিনি আরও বলেন, বাসার এত লোকজনের মধ্যে আমার মেয়ের মৃত্যু কেও দেখতে পেলো না। এটি অবিশ্বাস্য। এমন কাণ্ড হতে পারে না।

মিতা নূরের স্বামী শাহনূর একটি কক্ষে দরজা আটকে অবস্থান করছিলেন। কারও সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলেন না। গুলশান থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, মিতা নূরের মৃত্যু রহস্যজনক। আগে থেকেই দাম্পত্য কলহ চলছিল। কয়েকদিন আগেও মিতা নূর তার স্বামীর অফিসে গিয়ে বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের ডেকে নেন। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়। কাজেই দু’জনের দ্বন্দ্বমুখর পরিস্থিতিতে এমন মৃত্যু নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। এদিকে মিতা নূরের মৃত্যু রহস্য জানতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ কয়েক ধরনের আলামত সংরক্ষণ করেছে। সিআইডি’র ইন্সপেক্টর শামসুদ্দিন বলেন, পরীক্ষার জন্য মিতা নূরের ওড়না, মুখের লালা ও গোপন অঙ্গের ‘সফ’ সংরক্ষণ করা হয়েছে। এসব আলামত পরীক্ষার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। সূত্রমতে, সমপ্রতি মিতা নূরের ছোট বোনকে পাত্রপক্ষ দেখতে গিয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানে শাহনূরকে যেতে বললেও তিনি যাননি। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে তুমুল ঝগড়া বাধে। একপর্যায়ে মিতা নূর তার স্বামীর মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে যান। পরে তার অফিসে গিয়ে কম্পিউটার সহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন। একপর্যায়ে পুলিশ হাজির হয়ে দু’জনের দ্বন্দ্ব মেটানোর চেষ্টা করে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন গুলশান থানার ওসি (তদন্ত) নূরে আযম।

পুলিশ ও মিতার ঘনিষ্ঠ স্বজনরা জানান, সমপ্রতি মিতার স্বামী নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করেছেন। সেখানে মাঝে-মধ্যেই বন্ধুবান্ধব নিয়ে রাত পর্যন্ত আড্ডা দিতেন। এর মধ্যে একদিন হঠাৎ করেই মিতা নূর সন্দেহের বশে তার স্বামীর অফিসে যান। দেখেন কয়েকজন তরুণীর সঙ্গে শাহনূর আড্ডা দিচ্ছেন। এটি দেখেই তার জিদ চেপে বসে। দু’জনের সম্পর্ক নিয়ে মিতা নূরের গাড়ি চালক সবুজ বলেন, ম্যাডাম (মিতা নূর) শনিবার দুপুরে তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে বাসাবো গিয়েছিলেন। সেদিন গাড়িতে বসা অবস্থায় মোবাইলে ফোনে ম্যাডাম ও স্যারের (স্বামী শাহনূর) মধ্যে ঝগড়া বাঁধে। তারপর ম্যাডাম নিকেতন অফিসে যান। বিকালে সেখানে পুলিশের একটি ভ্যান আসে। এরপর রোববার সারাদিন বাড়ি থেকে কোথাও বের হননি ম্যাডাম। এ নিয়ে মিতা নূর ও শাহনূর রহমান রানার দুই ছেলে- সাদমান নূর প্রিয় ও শেহজাদ নূর পৃথী এবং কাজের দু’টি মেয়ে কিছুই বলতে রাজি হয়নি।

এদিকে মিতার ঘনিষ্ঠজনরা জানান, লিয়াং ফ্যাশন ও ইমিনেজ ডিজাইন নামে দু’টি প্রতিষ্ঠানের (সিইও) মালিক শাহনূর রহমান মজুমদার ওরফে রানা। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে কথা না বললেও বিকালের দিকে মুখ খোলেন। সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, তার স্ত্রী মিতা নূর আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু কি কারণে করেছেন কিছুই জানেন না। রাতে একই বিছানায় শুয়েছিলেন। সকাল সাড়ে ৬টা থেকে পৌনে ৭টার মধ্যে ঘুম ভেঙে গেলে দেখতে পান, পাশে তার স্ত্রী নেই। এঘর-ওঘর খুঁজে ড্রইংরুমের দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখতে পান, তার স্ত্রী ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলে আছে। এরপর নিজেই গুলশান থানায় ফোন করেন। পরে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে। তবে ঘনিষ্ঠজনরা জানান, মায়ের রহস্যজনক মৃত্যুর পর ছেলেরা দিশাহারা হয়ে পড়েছে। একদিকে মাকে হারিয়েছে অন্যদিকে পিতার কারণে মায়ের মৃত্যু হলেও তারা কিছুই বলতে চাইছে না। বাবার বিরুদ্ধে বলে বাবাকেও হারাতে চাইছে না। দুই পরিবারের লোকজনও চাইছেন সম্মানজনক সমাধান। একারণে কেও কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন না। তবে এ ঘটনার রহস্য যাই হোক না কেনো, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে উন্মোচিত হবে এটিই জনমনের প্রত্যাশা।

বনানী কবরস্থানে দাফন

এদিকে ময়না তদন্ত শেষে গতকাল বাদ মাগরিব রাজধানী বনানী কবর স্থানে মিতা নূরের লাশ দাফন করা হয়েছে। এর আগে বাদ আছর আজাদ মসজিদের সামনে তার নামাজে জানাজা হয়। জানাজায় অভিনয় জগতের শিল্পী, কলা, কলা-কুশলী, নিকট আত্মীয় স্বজন ছাড়াও বহু ভক্ত অনুরাগীরা অংশ নেন।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...