The Dhaka Times
তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে রাখার প্রত্যয়ে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ম্যাগাজিন।

কাশ্মীর ৭৫ লাখ রুপিতে বিক্রি হয়েছিল!

কাশ্মীরের মোট আয়তন ছিল ৮৪ হাজার ৪৭১ বর্গ মাইল। তখন মানুষ ছিল ২৫ লাখ

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ কাশ্মীরের জনগণের জীবনে ১৭৩ বছরের ব্যবধানে আরেকটি পরিবর্তন এলো গত সপ্তাহে। অথচ ১৮৪৬ সালে এই জাতিগোষ্ঠী বিক্রি হয়েছিল মাত্র ৭৫ লাখ রুপিতে!

কাশ্মীর ৭৫ লাখ রুপিতে বিক্রি হয়েছিল! 1

সংবাদ মাধ্যমের খবরে জানা যায়, এই রুপি নাকি ভারতীয় রুপি নয়। এটি ওই সময়কার পাঞ্জাবে প্রচলিত রুপির নাম ছিল নানকশাহী। বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্‌দৌলাকে যেভাবে একদল দেশীয় রাজাকারের সহায়তায় পরাস্ত করেছিলো বাঙালির স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে শেষ পর্যন্ত পরাধীনতার শৃঙ্খলে আটকে দিয়েছিল, একশ’ বছরের ব্যবধানে তারা সেটিই নাকি ঘটিয়েছিল কাশ্মীরে।

১৮৪৬ সালের ১৬ মার্চের কথা। একটি জাতি, একটি জনগোষ্ঠী। গরু যেভাবে বিক্রি হয় ঠিক সেভাবেই বিক্রি করে দিয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গোলাপ সিং এর কাছে! কাশ্মীরের মোট আয়তন ছিল ৮৪ হাজার ৪৭১ বর্গ মাইল। তখন মানুষ ছিল ২৫ লাখ।

অপরদিকে জম্মুর বাসিন্দা ছিলেন গোলাপ সিং। তিনি তরুণ বয়সে মহারাজা রঞ্জিত সিং এর দরবারে যোগ দেন। তারপর তিনি সেই দরবারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে উন্নীত করতেও সক্ষম হন। শিখ মহারাজা রঞ্জিত সিংহ ১৮৩৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। লাহোরে ছিল তার দরবার। তবে তার মৃত্যুর পর লাহোর দরবার অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়ে। তখন এই অবস্থায় নিজেকে কিংডম এর রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখেন গুলাপ সিং। তিনি হাত মেলালেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সেই সময় ওই এলাকা নিজেদের অধীনে আনার জন্য পলাশীর আম্রকাননের মতোই নানা ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করছিলো। সেই সময় একজন গোলাপ সিং নিজেকে বৃটিশ অনুগত হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে থাকেন।

১৮৪১ সালের কথা। তখন উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে আফগানদের বিরুদ্ধে বৃটিশরা যুদ্ধ করেছিল। সেই যুদ্ধের সময় বৃটিশদের পক্ষ অবলম্বন করেন তিনি। এরপর চলে এলো তারই স্বজাতি শিখদের বিরুদ্ধে বৃটিশ যুদ্ধের দামামা। সেক্ষেত্রেও গুলাপকে দেখা গেলো অনেকটা রাজাকারের ভূমিকায়।

১৮৪৫ সালের নভেম্বর মাসের কথা। বৃটিশদের সঙ্গে যুদ্ধ হলো সোবরানে। পলাশীর যুদ্ধের মতোই এটিও শিখদের জীবনে সোবরান যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত। হয়তো সে কারণেই পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী এবারের ভারতে বিজিপির দ্বারা কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা খর্ব করার বিরুদ্ধে সোচ্চার। কারণ হলো তাদের ইতিহাসের সঙ্গে কাশ্মীরের সম্পর্ক রয়েছে। ১৮৪৫ সালে শিখ মুক্তিযোদ্ধারা গুলাব সিংকে অনুরোধ করেছিলেন যে, তাদেরকে আসন্ন যুদ্ধে সাহায্য করার জন্য। তবে গোলাব সিং কুটবুদ্ধির মানুষ ছিলেন। তিনি নানা ফন্দি-ফিকির করে তাদেরকে সহযোগিতা হতে বিরত থাকলেন। মীরজাফরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন তিনি।

উইলিয়াম এডওয়ার্ড লিখেছেন যে, গুলাব সিং সেনাবাহিনীকে অনুরোধ করেছিলেন যাতে করে তিনি তাদের সঙ্গে যোগ না দেওয়ার আগ পর্যন্ত বৃটিশদের বিরুদ্ধে হামলা না চালান। তবে তিনি সেই যোগদান কখনও করেননি। নানা অজুহাতে তিনি সেটা এড়িয়েই গেছেন। কারণ হলো তিনি জানতেন যে কালক্ষেপণ করলে বৃটিশরা শিখদের পরাস্ত করতে পারবে। বাস্তবেও ঠিক তাই ঘটলো। সেজন্যই গুলাব ব্যক্তিগতভাবে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। তিনি তার বিশ্বাসঘাতকতার জন্য লাহোর দরবারের ক্ষমতা পেলেন এবং সেটিই তাকে উত্তর ভারতে ডোগরা কিংডম প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দিলো। যুদ্ধ বাধানোর জন্য বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শিখদেরকেই দায়ী করলো। সেই সময় যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি করলো দেড় কোটি রুপি।

তাদের পক্ষে সেটা দেওয়া কোনো মতেই সম্ভব ছিল না। তখন লাহোরের দরবারের রাজা ছিলেন দুলীপ সিং। তিনি ছিলেন দুর্বল। তাই সহজেই তাকে অপসারণ করে বৃটিশরা লাহোর চুক্তির আওতায় গোলাপ সিংকে সার্বভৌম স্বাধীন সার্বভৌম নৃপতি হিসেবে ঘোষণা করলো। ১৮৪৬ সালের ৯ মার্চ স্বাক্ষর করা চুক্তির আওতায় নয়নাভিরাম কাশ্মীরের পাহাড়গুলো ছিল না। এরপর তা পার্শ্বচুক্তি করে বৃটিশরা তার দখলদারিত্ব তুলে দেয়। তার সাত দিন পরই সেই কুখ্যাত কাশ্মীর বিক্রি চুক্তি হলো।

এই ধরনের চুক্তির কথা ইতিহাসে কেও কখনও শোনেনি যে, একটি জনগোষ্ঠীকে তার নদী-নালা খাল-বিল ক্ষেত-খামারসহ একজন মাত্র ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এটি হয়তো পৃথিবীর ইতিহাসের একমাত্র কুখ্যাত চুক্তি। যা দিয়ে একটি জাতি রাষ্ট্রকে বিক্রি করে দিয়েছিল সেই সময়ের বৃটিশ সরকার!

ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বহু ধরনের অভিযোগের কথা শোনা যায়। বহু কাহিনীর কথা বিশ্বের দেশে দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে দীর্ঘদিন যাবত। তবে কাশ্মীরি চুক্তির মতো লজ্জাজনক বিক্রি মনে হয় কেও কখনও শোনেনি ইতিহাসে।

বৃটিশ সরকার তাদের অতীতের কৃতকমের্র বহু কিছুর জন্য তারা ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন কিন্তু এই কাশ্মীর বিষয়ে তারা একেবারে নীরব। ৭৫ লাখ রুপিতে বিক্রি করে দেওয়ার জন্য তারা কোনোদিন অনুশোচনাও করেনি।

ডোগরা শাসনে কাশ্মীরি জনগণের উপরে বিরাট নির্যাতন এবং নিপীড়নের ইতিহাস সকলেরই কম বেশি জানা আছে। তাই একবাক্যে বলা যায়, কাশ্মীরের মুসলমানরা এক নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছিলেন। মুসলমানদের বিরুদ্ধে অন্যায় অত্যাচার নির্যাতন ছিল ডোগরা শাসনের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় যা ঘটলো তাতো অনেকের জানা। দেশভাগের মূলমন্ত্র ছিল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল ভারতে থাকবে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলো পাকিস্তানে চলে যাবে। সে কারণেই খুব স্বাভাবিকভাবেই জম্মু-কাশ্মীরের মুসলমানরা পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করেন। তবে এখানেও আবার ষড়যন্ত্রমূলকভাবে রাজা হরি সিং তখন জম্মু-কাশ্মীরের শাসক ছিলেন। তিনি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ও লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে গোপন যোগসাজশ করলেন। আর তার ফলশ্রুতিতে কাশ্মীরিরা না যেতে পারলো পাকিস্তানে, না পেলো নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার। আজ সেই কাশ্মীরকে কিভাবে ভারতীয়রা নিয়ন্ত্রণ করছে সেটি আমাদের সকলের জানা। তথ্যসূত্র: www.deshebideshe.com

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
Loading...