আবারও গুমের ঘটনা? ৪৪ দিন লুকিয়ে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ র‌্যাবের বিরুদ্ধে

ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ র‌্যাবের বিরুদ্ধে আবারও গুম করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র শাহ আলিফ প্রিন্সকে র‌্যাব নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে বলে তার পরিবার অভিযোগ করেছে। আটকের ৪৪ দিন পর নানা প্রতিশ্রুতি নিয়ে তাকে মুক্তি দেয় র‌্যাব।

মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এ তথ্য জানিয়ে বলেছে, এটি শুধু আটক ও নির্যাতনের ঘটনা নয়, আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী এটি একটি গুমের ঘটনা। তারা প্রিন্সের নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন।

অধিকার জানায়, রাষ্ট্রের এজেন্ট আইনশৃংখলা বাহিনী শাহ আলিফ প্রিন্সকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সুস্পষ্ট অভিযোগ থাকলেও র‌্যাব তা অস্বীকার করেছে এবং ৪৪ দিন আটক রেখে নির্যাতনের ব্যাপারে তারা নিশ্চুপ রয়েছে। প্রিন্স চিরতরে ‘গুম’ হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেলেও ‘অধিকার’ তার জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। ৪৪ দিন লুকিয়ে রেখে প্রিন্সের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। বিষয়টি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকেও আমলে নেয়ার আবেদন জানিয়েছে অধিকার। দেশে বিপজ্জনক হারে নাগরিকদের গুম করে ফেলা হচ্ছে জানিয়ে অধিকার জানায়, জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও দায়মুক্তির বিরুদ্ধে সরকার যে অবস্থান ঘোষণা করেছিল তার অর্থহীনতা এরই মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।

অধিকার জানায়, পড়াশোনার পাশাপাশি প্রিন্স মোবাইল ফোন কোম্পানি এয়ারটেলের রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের কাস্টমার সার্ভিসে চাকরি করে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করত। এ ঘটনার পর সেখানে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিংয়ের ১৩ নম্বর রোডের ১ নম্বর ভবনের বাসিন্দা শাহজাহান আলী ও ফাহিমা খাতুন জ্যোৎস্নার ছেলে শাহ আলিফ প্রিন্স (২৪)। ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তাকে শ্যামলী শাহী মসজিদ এলাকা থেকে সাদা পোশাকে র‌্যাব-২ সিপিসি ৩-এর সদস্যরা ধরে নিয়ে যান। দীর্ঘ এক মাস ১৪ দিন লুকিয়ে রেখে তার ওপর র‌্যাব সদস্যরা নির্মম নির্যাতন চালান বলে অধিকারকে জানিয়েছেন তার স্বজনরা। ১০ এপ্রিল র‌্যাব ৫-এর সদস্যরা প্রিন্সকে বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশের হাতে তুলে দেয়।

অভিযোগ আনা হয়, প্রিন্স নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুত তাহরিরের পক্ষে সদস্য সংগ্রহ ও প্রচারণা চালিয়েছে। ১৬ এপ্রিল আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান তিনি। প্রিন্স অধিকারকে জানান, ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পথে শ্যামলী শাহী মসজিদ এলাকা থেকে সাদা পোশাকধারী কয়েকজন লোক তাকে র‌্যাব সদস্য পরিচয় দিয়ে জানান, তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা আছে। একথা বলেই তারা তার হাতে হাতকড়া পরিয়ে র‌্যাব ২-এর মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদ ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখানে তার কাছ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে যান তারা। পরে তাকে নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুত তাহরিরের কার্যক্রম ও সংগঠনটির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চান। এ সংগঠনটির সঙ্গে তার কোন সম্পৃক্ততা নেই জানালে র‌্যাব সদস্যরা কালো কাপড় দিয়ে তার চোখ বেঁধে ফেলেন। রাতভর তাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হিজবুত তাহরির প্রসঙ্গে তথ্য জানতে চান। ভোরের দিকে তার চোখের বাঁধন খুলে দিলে তিনি যে র‌্যাব হেফাজতে আছেন সেটা তার পরিবারকে জানানোর জন্য অনুরোধ করেন। এতে র‌্যাব সদস্যরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে তার ওপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেন।

প্রিন্স অধিকারকে জানান, এমন কোন ধরনের নির্যাতন নেই যা তার ওপর করা হয়নি। র‌্যাব সদস্যরা তাকে সর্তক করে দিয়ে বলেছেন, ৪৪ দিন র‌্যাবের হেফাজতে থাকার সময়ের নির্যাতনের কথা কাউকে বললে ঝালকাঠি জেলার লিমনের মতো পঙ্গু করে দেয়া হবে।

প্রিন্স আরও জানান, পরদিন ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টার দিকে তার চোখ বেঁধে একটি গাড়িতে তোলে। গাড়িটি কিছুক্ষণ চলার পর এক জায়গায় গিয়ে থামে। সেখান থেকে আরও কিছুদূর নিয়ে তার চোখের বাঁধন খুলে দেয়। সেখানে দেখতে পান, একটি আবছা অন্ধকার কক্ষ ও একটি টয়লেট। সেটাকে অন্য কোন র‌্যাবের ক্যাম্প বলে মনে হয়েছে তার। সেখানে কখনও দিনে ও কখনও রাতে র‌্যাব সদস্যরা এসে তাকে বের করে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে যেতেন এবং হিজবুত তাহরিরের কার্যক্রম ও এর নেতাকর্মীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। তিনি কিছুই জানেন না বলে জানালে তাকে পেটানো হতো। এভাবে দিনের পর দিন সেই কক্ষেই থাকতে থাকতে তিনি কয়েকবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। ৯ এপ্রিল দুপুর আনুমানিক ১২টায় একজন র‌্যাব সদস্য তার চোখ কালো কাপড়ে বাঁধেন। তিনি তখন তার কাছে জানতে চান, তাকে কোথায় নেয়া হচ্ছে। সেখান থেকে তাকে একটি গাড়িতে করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে ছবি তোলা হয়। পরে আবার অন্য একটি গাড়িতে তোলা হয়। কয়েক ঘণ্টাব্যাপী সেটা চলতে থাকে। সন্ধ্যার দিকে গাড়িটি অপর এক জায়গায় গিয়ে থামে। গাড়ি থেকে নামিয়ে একটি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। ১০ এপ্রিল রাত ৩টার দিকে সাদা পোশাকধারী একজন র‌্যাব সদস্য তার কাছে জানতে চান, ‘প্রিন্স তুমি কি এভাবেই সারা জীবন থাকবে, না মুক্ত জীবনে ফিরবে। মুক্তি পেতে চাইলে আমরা যা বলব তা তোমাকে করতে হবে। একটি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তোমাকে ছাড়া হবে। একটু ভেবে আমাকে জানাও’। তিনি র‌্যাব সদস্যদের সব শর্ত মেনে নিতে রাজি হলে রাত ৪টার দিকে একটি জায়গায় নিয়ে কিছু কাগজপত্র ভর্তি একটি ব্যাগ কাঁধে দিয়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়া হয়। রাস্তার পাশের সাইনবোর্ড দেখে বুঝতে পারেন এলাকাটি রাজশাহী জেলার মতিহার থানার তালাইমারী। কিছুক্ষণ পর অপর দু’জন র‌্যাব সদস্য সেখানে গিয়ে তার ব্যাগ তল্লাশি করে ব্যাগের ভেতর থেকে হিজবুত তাহরিরের কিছু কাগজপত্র বের করেন। তখন তারা দু’জন সাক্ষী হাজির করে হিজবুত তাহরিরের সদস্য বলে সাক্ষর নেন। সেখান থেকে র‌্যাব ৫-এর কার্যালয়ে নিয়ে টেবিলের সামনে দাঁড় করিয়ে ছবি তোলার পর তাকে মতিহার থানায় নিয়ে যায়। পরে সেখানকার এক পুলিশ সদস্য তাকে জানান, র‌্যাব ৫-এর রেলওয়ে কলোনি ক্যাম্পের ডিএডি একেএম মিজানুর রহমান বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ১০ এপ্রিল বোয়ালিয়া মডেল থানায় তাকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ সদস্যরা তাকে বিকাল ৪টার দিকে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠিয়ে দেন। আদালত রিমান্ড মঞ্জুর না করে তাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায়। ১৬ এপ্রিল রাজশাহী মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত থেকে প্রিন্স জামিনে ছাড়া পান। আলিফের বাবা শাহজাহান আলী (৫৬) একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি ৯ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। প্রিন্সের নিখোঁজের বিষয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি নিউ মার্কেট থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করেন তার স্বজনরা। পরে পুলিশের পরামর্শে মোহাম্মদপুর থানায়ও একটি সাধারণ ডায়রি করেন তারা এবং আলিফ নিখোঁজ হয়েছে উল্লেখ করে একটি জিডি করেন। তথ্য সূত্র: দৈনিক যুগান্তর।

বিষয়গুলো নিয়ে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য বের করা দরকার। তা নাহলে সামপ্রতিক সময়ে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও তার ড্রাইভার নিখোঁজের ঘটনার পর প্রশাসনের বিরুদ্ধে যে গুমের অভিযোগ তোলা হচ্ছে সে অভিযোগ থেকে কেও বাদ যাবেন না বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...