মৃত্যুপুরীতে বসবাস?

এম আবদুল হাফিজ ॥ এ দেশের মানুষের কাছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদ্য প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনটি কোন অভিনব বার্তা বহন করে না। তারা হাড়ে হাড়ে বোঝে ও জানে বিচারবহির্ভূত হত্যা-মচ্ছবের তথ্য এবং নীরবে অন্তরে বহন করে এসব হত্যার দুঃসহ স্মৃতি ও কষ্ট।

ইতিপূর্বেও দেশী-বিদেশী মানবাধিকার সংস্থাগুলো একই প্রকার তথ্য বাংলাদেশ সম্বন্ধে তুলে ধরেছে, যার প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়ায়ও এ দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহতা কোন গুরুত্ব পায়নি। এমন প্রতিবেদন বারবার প্রকাশিত হওয়ার পরও ক্রসফায়ার, পুলিশ হেফাজত বা রিমান্ডে নির্যাতনজনিত মৃত্যু হ্রাস পাওয়া তো দূরের কথা, এসবের মাত্রা বরং বেড়েই চলেছে। বেড়ে চলেছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সামাজিক অস্থিরতা এবং আইন-শৃংখলা বাহিনী বিশেষ করে এলিট ফোর্স র‌্যাবের বাড়াবাড়ি। প্রকারান্তরে দেশ পরিণত হয়েছে পুলিশ নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রে, যেখানে যুক্তির ভাষা বল প্রয়োগে স্তব্ধ হয়েছে। একটি ক্ষমতা মদমত্ত সরকার যেন যুদ্ধ ঘোষণা করেছে তারই কাছে নিরাপত্তা প্রার্থী জনগণের বিরুদ্ধে।

তাই চারদিকে এত মৃত্যুর ছড়াছড়ি। এই মৃত্যুর অনেক সংবাদ অজ্ঞাত থেকে গেলেও মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা যেটুকু অবহিত হই, সেটাই যথেষ্ট একথা প্রমাণ করতে যে, আমরা যেন এক সাক্ষাৎ মৃত্যুপুরীর মধ্যেই অবস্থান করছি। সংবাদপত্রে আমরা যেসব বেওয়ারিশ লাশ, খণ্ডিত মৃতদেহ, গলিত-অর্ধগলিত লাশের পথেঘাটে, খানাখন্দে, ডোবা-জলাশয়ে পড়ে থাকার খবর পড়ি, তারা কারা? তাদের কি কোন স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে? এসব মৃতের মৃত্যুর দায়ভার কার? একটি দেশ সম্বন্ধে যে কারও কী ধারণা জন্মাতে পারে, যেখানে বাজারের ব্যাগে খণ্ডিত মস্তক পাওয়া যায়?

এসব অস্বাভাবিক মৃত্যুর কি কোন সঙ্গত ব্যাখ্যা আছে? রাষ্ট্র কি তার নাগরিকদের জন্য তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে? ক্ষমতাসীনরা অবশ্যই বিচারবহির্ভূত মৃত্যুর পক্ষে নয়। কিন্তু তা যাতে না ঘটতে পারে তার ব্যবস্থা গ্রহণ কি তারা নিশ্চিত করেছে? এসব প্রশ্নবাণে জর্জরিত কর্তৃপক্ষ যতই তারস্বরে তার নির্দোষ থাকার কথা বলুক, তা কি বিশ্বাস বা গ্রহণযোগ্য?

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের গুম, পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু, অকারণে নিয়মবহির্ভূতভাবে সাদা পোশাকধারী ডিবি পুলিশের গ্রেফতার এবং বিচারপূর্ব দীর্ঘ কারাবাসকেও মানবাধিকার লংঘন বলা হয়েছে। এসবের পাশাপাশি তো আরও রয়েছে সর্বজনবিদিত বিচার বিভাগের রাজনীতিকরণ, বাক-স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা ও সাংবাদিক নির্যাতন এবং সর্বগ্রাসী রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যু। এ বাস্তবতার মধ্যেই বাঁচতে হয় এ দেশে।

ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ ও সাগর-রুনীর মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে সরকারের দুর্বোধ্য ঔদাসীন্য ও ব্যর্থতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক অ্যামনেস্টি। সংস্থাটির মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহারে বাংলাদেশে মানবাধিকারের দৃশ্যমান কোন উন্নতি নেই। ক্ষমতাসীনরা তাদের ক্ষমতার শেষ বেলায় স্বভাবতই তাদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত। এটাই স্বাভাবিক। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটও তাই করেছিল তাদের মেয়াদের অন্তিম সময়ে। মাঝে মাঝে ভাবি, এমনই কদর্য বাস্তবতার মধ্য দিয়েই আমরা ফুরিয়ে যাব। দেশ ও তার ভবিষ্যৎ নিয়ে যতই আশাবাদ পোষণ করি, যতই আশায় বুক বাঁধি এবং উন্মুখ অপেক্ষায় থাকি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন দেখব বলে- পরক্ষণেই তা ধসে পড়ে হত্যা, গুম, নির্যাতনে এক গুলাগ বা গুয়ানতানামো সদৃশ এ দেশের ভাবমূর্তি গড়ে ওঠা দর্শনে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের নৃশংসতা নিয়ে কথা বলা যায়, প্রতিবাদ করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের আইন-শৃংখলা বাহিনীর বিরুদ্ধে নেতিবাচক বক্তব্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। সে যেন শ্বাপদসংকুল অরণ্যে বাস করে ব্যাঘ্রের লেজে হাত দেয়া। যদিও অনেক অপরাধের সঙ্গেই নাকি তাদের কমপ্লিসিটি একটি ওপেন সিক্রেট। ইদানীং সংবাদপত্রে দেখেছি, তারা নাকি আওয়ামী ক্যাডারদের সঙ্গে মিলেমিশে চাঁদাবাজি করে।

কিন্তু তারা তো এ দেশের বাস্তবতায় সবকিছুই করতে পারে। কেননা, খোদ সরকার টিকে থাকার জন্য এবং সরকারের প্রতিপক্ষকে ঠেঙানোর জন্য তাদের ওপরই নির্ভরশীল। সুতরাং তাদের মধ্যে পারস্পরিক একটা আপস-সমঝোতা থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু কতদিন তারা একটি আন্তর্জাতিক বিরূপ প্রতিক্রিয়া উপেক্ষা করে চলতে পারবে- সেটাই আশার কথা, যদিও সে আশা অত্যন্ত ক্ষীণ। কেননা, এখন তো দেশে প্রতিবাদের সুযোগও আর থাকছে না। বিরোধী দলও তার অতীতের সব গ্লানি সর্বাঙ্গে জড়িয়ে নিত্য নতুন মামলায় জর্জরিত। তারা শাসরুদ্ধকর বর্তমান রাজনৈতিক আবহে কতটা সুবাতাসের সঞ্চার করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

আমরা জানি না, বাংলাদেশের এই মৃত্যুপুরীতে অহরহ লাশের গন্ধের বিকৃত এক বাস্তবতায় কতকাল প্রলম্বিত হবে এ দেশবাসীর বসবাস। শেষ পর্যন্ত কি সব আশা নিভে গেলে আমরা একটি নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে দীর্ঘ পথের এক কানাগলিতে আটকে যাব, যেখান থেকে নিষ্ক্রমণের কোন পথ নেই? কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি যে আমাদের ত্রাণকর্তা একজন আছেন, যিনি শক্তি মদমত্তদের সব কৌশলের জালকে মাকড়সার জালের মতো ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারেন। যিনি তার এক প্রেরিত পুরুষকে মাছের পেটের অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। সর্বোপরি অনুকূল ও প্রতিকূল অবস্থার স্রষ্টাও তিনি।

মানুষের ভাগ্যের চালিকাশক্তিও একই উৎসের সৃষ্টি। আমি আইয়ুব-ইয়াহিয়ার প্রায় একই প্রকার শক্তি মদমত্ততা দেখেছি। বিশ্বের বিভিন্ন সময়কার বিভিন্ন স্বেচ্ছাচারীর একই প্রকার ক্ষমতার খেলা ও বিয়োগান্ত ভাগ্য বরণের ইতিকথা সমসাময়িক ইতিহাসে পড়েছি। আমাদের স্বৈরশাসকদেরও ভাগ্য যে অভিন্নই হবে সে সম্বন্ধে আমি নিশ্চিত। ইতিমধ্যে মানুষের মঙ্গল কামনায় বা অন্যায়ের প্রতিরোধে বা সত্য ভাষণের জন্য যারা শাসকগোষ্ঠীর কোপানলে পড়ে নিখোঁজ, অপহূত বা অস্বাভাবিক ও অজ্ঞাত মৃত্যুর শিকার হয়েছেন, লাখো মানুষের মানসপটে অংকিত তাদের সমাধিতে আমাদের ‘এপিটাফ’ : আমরা তোমাদের ভালোবেসেছিলাম। (এদেশের জনগণের কথা ভেবেই দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত লেখাটি প্রকাশ করা হলো)।
এম আবদুল হাফিজ : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

Advertisements
Loading...