ঈদের ছুটির মধ্য দিয়েই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে হলমার্ক

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ ঈদের ছুটির মধ্য দিয়েই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বহুল আলোচিত হলমার্ক গ্রুপ। গরু বিক্রি করে গত ২১ অক্টোবর গভীর রাত পর্যন্ত শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হয়েছে। বাকি বেতন দেওয়া হবে ২৪ অক্টোবর। তার পরেই কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে প্রতিষ্ঠানটি। জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণের নামে ব্যাংকের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় অভিযুক্ত এ প্রতিষ্ঠানে চার মাস ধরে কোনো কাজ নেই।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম সূত্রে বলা হয়েছে, হলমার্কের ৩৪ জিএমের মধ্যে ৩২ জন এরই মধ্যে চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। শ্রমিক ছাড়া শীর্ষ পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা নেই। কোনো ব্যাংক এলসি খুলতে রাজি হচ্ছে না, নগদ টাকা নেই; কাজ পাওয়ারও সম্ভাবনা নেই। এ রকম পরিস্থিতিতে হলমার্কের ৮৪ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চালু থাকা ২৫টি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন হলমার্কের প্রধান কার্যালয়ের মাঝারি শ্রেণীর কর্মকর্তারা। কারখানা বন্ধের কারণে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বেন। আগামী বৃহস্পতিবার থেকে ঈদের ছুটি শুরু হবে হলমার্কে। এই ছুটি শেষে কর্মীরা আর প্রতিষ্ঠানে ফিরবেন না। তবে একই সঙ্গে সরকারের কাছে দাবি উঠেছে, প্রশাসক নিয়োগ করে প্রতিষ্ঠানটি রক্ষা করার।

হলমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদের খামারে ২ হাজার ৭০০ গরু রয়েছে। এসব গরু কোরবানির পশু হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। গরু বিক্রির প্রায় ১৫ কোটি টাকা গত ২১ অক্টোবর বেতন হিসেবে শ্রমিকদের দেওয়া হয়। বাকি গরু বিক্রি করে আগামী ২৪ অক্টোবর চলতি মাসের ২৫ দিনের বেতন ও ঈদ বোনাস দেওয়া হবে বলে শ্রমিকদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

অপরদিকে, তানভীর মাহমুদ এবং প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত তার স্ত্রী জেসমিন ইসলামের গ্রেফতারের পর হলমার্কে ব্যাপক লুটপাট করছেন শ্রমিকরা। হলমার্ক গ্রুপের ৩৪ জন জেনারেল ম্যানেজারের মধ্যে দু’জন ছাড়া বাকিরা লুটপাট করে এরই মধ্যে সটকে পড়েছেন। তানভীর গ্রেফতার হওয়ার পর পরই তারা তাদের দায়িত্বে থাকা টাকা, কাপড়, কেমিক্যাল ও মেশিনপত্র নিয়ে সরে পড়েছেন। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যে যা পারছে, নিয়ে যাচ্ছে। শ্রমিকদের সঙ্গে তানভীরের পোষা স্থানীয় মাস্তানরাও লুটপাট করছে। রাতের অন্ধকারে মেশিনপত্র ও মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যাচ্ছেন শ্রমিকরা। ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা না থাকায় শ্রমিকরা কেও কারও কথা শুনছেন না। পাওনা টাকা আদায়ে ভবিষ্যতে ব্যাংক হলমার্কের সম্পত্তি ক্রোক করলে স্থায়ী অবকাঠামো ছাড়া আর কিছু্‌ই পাবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে সাভার থানার ওসি আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের হলমার্কের সম্পদ পাহারা দেওয়ার নির্দেশ দেয়নি। তার পরও পুলিশ মাঝে মধ্যেই প্যাট্রোল ডিউটি পালন করছে। ব্যক্তি-মালিকানাধীন সম্পদ পাহারা দেওয়া পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এ ছাড়া হলমার্ক কর্তৃপক্ষ সম্পদ বেহাত হওয়ার বিষয়ে পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগও করেননি বলে জানান তিনি ।

অভিযোগ উঠেছে, গত সপ্তাহে হলমার্কের নিটিং ও ডায়িং শাখার জিএম হাফিজুর রহমান তার শাখার কিছু শ্রমিকের সহায়তায় প্রায় ১০০ টন বিদেশি সুতা পাঁচ কোটি টাকায় বিক্রি করে ওই টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এরপর কয়েক কোটি টাকা মূল্যের কেমিক্যালভর্তি এক হাজার ২০০ ড্রাম বিক্রি করেছেন হাফিজুর রহমান। সর্বশেষ তিনি তিন কোটি টাকা মূল্যের একটি মেশিন বিক্রি করতে গিয়ে শ্রমিকদের বাধার মুখে পড়েন। এর পর থেকে মোবাইল ফোন বন্ধ করে লাপাত্তা রয়েছেন তিনি। হাফিজুর রহমান হলমার্ক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল শাখার সাবেক ডিজিএম (বরখাস্ত) একেএম আজিজুর রহমানের ভাতিজি জামাই। তার বাড়ি ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কাশিয়ানী গ্রামে। আজিজুর রহমানের ভাতিজি জামাই হওয়ার সুবাদে তানভীর ও তুষার মাহমুদের পরই হলমার্ক গ্রুপে প্রভাবশালী ছিলেন এই হাফিজুর রহমান।

গত সপ্তাহে জিরানীবাজারে হলমার্কের ফারহান টেক্সটাইলের ৭০ টন বিদেশি সুতা বিক্রি করে শ্রমিকরা প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। প্রায় প্রতিটি কারখানার কাপড়, ছোট ছোট মেশিন, কম্পিউটার, সুতা ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে যান শ্রমিকরা। হলমার্কের মূল কারখানায় প্রায় দেড় কোটি টাকার জুট কাপড় বিক্রি করে শ্রমিক ও স্থানীয় মাস্তানরা ভাগাভাগি করে নিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে হলমার্কের প্রায় ২৫ কোটি টাকার মেশিন আটকা পড়ে আছে। এসব মেশিন একটি সুযোগ-সন্ধানী চক্র আত্মসাৎ করার চেষ্টা করছে বলেও জানা গেছে। কিছু শ্রমিক ও স্থানীয় সন্ত্রাসী ২০ অক্টোবর গভীর রাতে তানভীর মাহমুদের পশ্চিম কাফরুলের বাসার ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। সেখানে ড্রাইভার ও আনসারদের কারণে তা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে তানভীরের চার তলার ওই বাসায় হলমার্কের গাড়িচালকরা থাকছেন। বাসার মালপত্র লুট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। হলমার্ক গ্রুপের জিএম শামীম আল মামুনও মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এমডি ও চেয়ারম্যান গ্রেফতার হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি দেখাশোনা করার মতো কেও নেই। তানভীরের ভাই ও শালাও পলাতক রয়েছেন। এখন প্রতিষ্ঠানটি কোনোরকমে চালাচ্ছেন হলমার্ক গ্রুপের ডিজিএম গুলশান আরা মুক্তা ও কমার্শিয়াল ম্যানেজার খোরশেদ আলম। তবে তাদের কথা কেও শুনছেন না। ছোট পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসে আসছেন না। শ্রমিকরা গরহাজির, এমনকি গাড়িচালকরা পর্যন্ত প্রয়োজনে দুদকে যেতে রাজি হচ্ছেন না। বেতন-বোনাসের খবরে শ্রমিকরা ভিড় জমান কারখানায়। অবশ্য এই বেতন-বোনাস বিতরণের মতো লোকবলও ছিল না হলমার্কের। হিসাব বিভাগের কর্মীর অভাবে বিভিন্ন ইউনিটের প্রধানদের মাধ্যমে বেতন-ভাতা দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তা ও শ্রমিকরা জানিয়েছেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার অভিযোগে হলমার্কের অজ্ঞাত ছয় হাজার কর্মীর নামে মামলা রয়েছে। গ্রেফতার এড়াতেই তারা অফিসে আসছেন না।

হলমার্কের প্রশাসন বিভাগের ডিএমডি গুলশান আরা জানান, কীভাবে প্রতিষ্ঠানটি চলবে, কিছুই বলতে পারছেন তিনি। এভাবে আগামী মাস চালানো সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, এমডি তো আর সারাজীবন জেলে থাকবেন না। তবে কারখানায় কাজ না পাওয়া গেলে চালানো সম্ভব নয়। কারখানা বন্ধের বিষয়ে তিনি প্রশাসনের সিদ্ধান্ত চান। হলমার্কের প্রধান কার্যালয়ের চতুর্থ তলায় কথা হয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফারুকের সঙ্গে। তিনি জানান, কারখানা চালানোর মতো কোনো অবস্থা নেই। ঈদের পর বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না।

হলমার্কের একাধিক শ্রমিক জানান, চার মাস ধরে কারখানায় কাজ নেই। কোনো ব্যাংক হলমার্কের নামে এলসি খুলছে না; নেই নগদ টাকা। এমডি ও চেয়ারম্যান জেলে থাকায় কাজ পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই। হলমার্কের ঊর্ধ্বতন কর্মকতারাও চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। সব মিলিয়ে কারখানা বন্ধ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তবে অধিকাংশ শ্রমিক দাবি করেন, সরকার হলমার্কে ডেসটিনির মতো প্রশাসক নিয়োগ করে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিককে বাঁচাতে পারে। হলমার্ক গ্রুপের ৮৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৫টি চালু থাকলেও কয়েক মাস ধরে ২৫টি কারখানায় প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক কর্মরত আছেন। কোনো কাজ না থাকায় এসব শ্রমিক চার মাস ধরে বসে বসে বেতন-ভাতা নিচ্ছেন। তবে গত মাসের বেতন পেতে বিলম্ব হওয়ায় অনেকে চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। স্থানীয় বাসার মালিকরা শ্রমিকদের বাসা ছেড়ে দিতে বলেছেন। তেঁতুলঝোড়ার হলমার্কের শ্রমিক সুরভী আক্তার বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে জেনে তার বাড়ির মালিক বাসা ছেড়ে দিতে বলেছেন। তিনি জানান, তারা চারজন একসঙ্গে ওই বাসায় ৭০০ টাকা জনপ্রতি ভাড়ায় থাকেন। হলমার্ক বন্ধ হলে বাড়িভাড়া দিতে পারবেন না ভেবেই বাসা ছাড়তে বলা হয়েছে। সুতিপাড়ায় কথা হয় হলমার্কের অঙ্গ-প্রতিষ্ঠান ববি ফ্যাশনের শ্রমিক আমেনা আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কারখানা বন্ধ হলে আমরা বেকার হয়ে যাব। সরকারের উচিত, আমাদের দায়িত্ব নেওয়া।’ হলমার্কের প্রধান কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সরকার ডেসটিনির মতো প্রশাসক নিয়োগ করে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের বাঁচাতে পারে।

সাভারের তেঁতুলঝোড়ায় হলমার্কের কারখানা ও রাজধানীর শেওড়াপাড়ার প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য ছিলেন না। প্রধান কার্যালয়ে কয়েকজন আনসার আর পিয়ন ছাড়া কোনো কর্মকর্তা নেই। চতুর্থ তলায় কয়েকজন শ্রমিক সংবাদপত্রে হলমার্ক সম্পর্কে প্রকাশিত বিভিন্ন পেপার কাটিং করছেন।

উল্লেখ্য, জালিয়াতির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে প্রায় দুই হাজার ৬৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে হলমার্ক গ্রুপ। এই অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির এমডি তানভীর মাহমুদ ও চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামসহ অভিযুক্তরা গ্রেফতার হয়েছেন।

Advertisements
Loading...