মিয়ানমারে ব্যাপক মুসলিম নিধন ॥ প্রায় এক লাখ লোক গৃহহীন

দি ঢাকা টাইমস্‌ ডেস্ক ॥ মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন (আরাকান) রাজ্যে নৃশংসভাবে মুসলিম নিধন চলছে। নতুন করে শুরু হওয়া সহিংসতায় ১১২ জন নিহত হয়েছে বলে সরকারিভাবে স্বীকার করা হয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো উগ্র বৌদ্ধদের গণহত্যার শিকার মুসলমানদের সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে জানিয়েছে। জুন মাসে দাঙ্গা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত জাতিসংঘের হিসাবে গৃহহীনের সংখ্যা অন্তত লাখ খানেক।

বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, মুসলিম অধ্যুষিত আকিয়াবের ২২টি গ্রামে এবারের সহিংসতায় মুসলমানদের প্রায় পাঁচ হাজার বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। গৃহহীন হয়ে পালাতে হয়েছে লক্ষাধিক মুসলমানকে। রোহিঙ্গা মুসলিম অধ্যুষিত পুরো এলাকা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের বরাত দিয়ে ইয়াঙ্গুনে অবস্থিত জাতিসংঘের আঞ্চলিক প্রতিনিধি ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, হতাহত ও উদ্বাস্তু হয়ে পড়া প্রায় সবাই সংখ্যালঘু মুসলমান, যারা রোহিঙ্গা জাতি নামে সেখানে পরিচিত। সহিংসতায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সীমান্তরক্ষী নাসাকা বাহিনীর সদস্যরা সহযোগিতা করেছে বলে মুসলিম নাগরিকরা অভিযোগ করেছেন। তারা জানিয়েছেন, সরকারি বাহিনীর সদস্যরা হামলাকারীদের বাধা না দিয়ে বরং ড্রাম ও জেরিকেন ভর্তি পেট্রল ও কেরোসিন সরবরাহ করে সহিংসতায় সক্রিয় সহায়তা দিয়েছে।

রাখাইন রাজ্যের সরকারি মুখপাত্র উইন মিয়ায় ২৬ অক্টোবর জানিয়েছেন, গত ২১ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সহিংসতায় ১১২ জন নিহত ও ১০টি শিশুসহ ৭২ জন আহত হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, পবিত্র ঈদুল আজহার প্রাক্কালে গত ২৫ অক্টোবর রাতে রাথা তোয়াং শহরতলিতে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এরপরই তা কায়য়োক শহরতলিতে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ গুলি ছুড়েছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করেও প্রত্যাখ্যাত হচ্ছেন হতভাগ্য রোহিঙ্গা মুসলমানরা। বাংলাদেশ সরকারের কড়া নির্দেশে বিজিবি ও কোস্টগার্ড সদস্যরা পুশব্যাক করছে আশ্রয় প্রার্থী রোহিঙ্গা মুসলিম নারী-পুরুষ-শিশুদের। ফলে অথৈ সাগরে অনাহারে অর্ধাহারে মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে অনেকে।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকার মিয়ানমারে নতুন করে সহিংসতায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের ব্যাপকভাবে হত্যা ও গৃহহারা করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের রক্ষায় এগিয়ে আসার জন্য আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহবান জানিয়েছে। অধিকার, হিউম্যান সিকিউরিটি অ্যালায়েন্স ও এশিয়ান মুসলিম নেটওয়ার্কের এ যৌথ বিবৃতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে হংকংভিত্তিক এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের রক্ষায় আন্তর্জাতিক সমর্থন ও সহযোগিতা প্রয়োজন। সহিংসতার শিকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাংলাদেশে আশ্রয় না দেয়ার ঘটনাকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করে এ ব্যাপারেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে বিবৃতিতে।

গত মে মাসে একজন বৌদ্ধ নারীকে কয়েকজন মুসলমান ধর্ষণ করেছে বলে গুজব রটে। এ খবরের পরিপ্রেক্ষিতে তখন বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা মুসলমানদের মধ্যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। তখন নিহত হয়েছিল ৯০ জন। এর পরপরই রাজ্যে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। তবে এবারের সহিংসতার কারণ কী তা জানা যায়নি। রোহিঙ্গা ও বৌদ্ধরা একে অপরকে দায়ী করছে।

এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে জাতিগত দাঙ্গায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট। থেইন সেইনের এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, রাখাইন রাজ্যের উপকূলীয় কায়োকপিউ এলাকার বেশিরভাগ ঘরবাড়ি পুড়ে গেছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বিধ্বস্ত ওই শহরটির স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশ করার পর সরকারের পক্ষ থেকে এই স্বীকারোক্তি দেয়া হয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উপগ্রহ থেকে ওই এলাকার যে ছবি নিয়েছে তাতে দেখানো হয়েছে জনবসতি নিঃশেষ হয়ে গেছে। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র বিবিসির কাছে ওই ছবির সত্যতা স্বীকার করেছেন। বলা হয়েছে এ ঘটনা ঘটেছে গত ২৪ অক্টোবর। তাতে আরও বলা হয়েছে, ওই সহিংসতা তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। ওদিকে জাতিসংঘ এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্‌বান জানিয়েছে। এ খবর দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, ওই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, উপগ্রহ থেকে তোলা ছবিতে দেখা যায়, কায়োকপিউ শহরের আট শতাধিক বাড়ি এবং বাড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয় এমন নৌকা পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। থেইন শয়ে নামে এক রোহিঙ্গা বলেছেন, তারা তাদের ঘরবাড়ি, অর্থসহ সর্বস্ব হারিয়েছেন। ঈদের দিনে তারা পশু কোরবানি দিতে পারেননি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক মুখপাত্র বলেন, রোহিঙ্গারা ‘হিংস্র’ আক্রমণের শিকার হয়েছেন। হাজার হাজার মানুষকে তাদের বাড়িঘর থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আক্রান্ত এলাকার মানুষ নৌকায় করে পালিয়েও কোথাও আশ্রয় পায়নি। বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে আসা রোহিঙ্গা মুসলমানদের অত্যন্ত নির্দয়ভাবে পুশব্যাক করা হয়েছে। এদের অধিকাংশই শিশু ও নারী। অনেকে একটি দ্বীপে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু তাদের আঞ্চলিক রাজধানী সিটয়ে শহরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না।

এদিকে মিয়ানমারে বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা মুসলিমদের মধ্যে নতুন করে দাঙ্গা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘ বলছে, এ সহিংসতায় বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার মানুষের জন্য জরুরি ত্রাণসাহায্য দরকার। মিয়ানমার সরকারের হিসাবেই জুন মাসে দাঙ্গা শুরুর পর থেকে ২০ হাজারের মতো লোক গৃহহীন হয়েছে। তবে জাতিসংঘের হিসাবে গৃহহীনের সংখ্যা অন্তত লাখখানেক, যাদের প্রায় সবাই রোহিঙ্গা মুসলিম। সরকারি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে শনিবার সহিংসতাকবলিত এলাকা সফরে গিয়ে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের এখন জরুরি ত্রাণসাহায্য প্রয়োজন।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...