ভয়ংকর ও রহস্যময় পুতুলের দ্বীপসহ কয়েকটি কাহিনী

দি ঢাকা টাইমস ডেস্ক ॥ প্রতি সপ্তাহের মতো আজও আমরা ভয়ংকর ও রহস্যময় পুতুলের দ্বীপসহ কয়েকটি কাহিনী আপনাদের সামনে তুলে ধরবো- আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে।


ভয়ংকর রহস্যময় পুতুলের দ্বীপ

স্থানীয় ভাষায় দ্বীপটির নাম ইলসা ডে লাস মিউনিকাস, ইংরেজিতে Island of the dolls বা পুতুলের দ্বীপ। মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটি থেকে ১৭ মাইল দক্ষিণে জোকিমিলকো (Xochimilco) জেলার এই দ্বীপটি কেমন যেন গা শিউরে দেয়ার মতো। এই দ্বীপজুড়ে শুধু পুতুল আর পুতুল। এ দ্বীপকে ঘিরে রয়েছে অদ্ভুত কিছু ভুতুড়ে কাহিনী। আজ থেকে ৮০ বছর আগের কথা, তিন মেক্সিকান শিশু পুতুলের বিয়ে দিচ্ছিল গাছে ঢাকা শীতল অন্ধকার এই দ্বীপটিতে। খেলতে খেলতে তাদের একজন নিখোঁজ! পরবর্তী সময়ে দ্বীপের পাশেই একটি খালে পাওয়া গেল তার মৃতদেহ। এরপর থেকে ভয়ে আর কেও ওই দ্বীপের ত্রিসীমানা মাড়ায়নি।

এ ঘটনার আরও ৩০ বছর পরের কথা, ১৯৫০ সালের দিকে ডন জুলিয়ান সানতানা নামের এক যাজক নির্জনে তপস্যা করার জন্য দ্বীপটিকে বেছে নিয়েছিলেন। জুলিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, দ্বীপটিতে আশ্রম গড়ে তোলার পর থেকে তার সঙ্গে মৃত শিশুটির আত্মার প্রায়ই কথা হয়। শিশুটির আত্মা জুলিয়ানের কাছে পুতুলের বায়না ধরে। তবে যেমন তেমন পুতুল নয়। বীভৎস সব পুতুল চেয়ে বসে শিশুটির আত্মা- যেগুলো দেখলে মনে হবে তারা মানুষের নির্যাতনে প্রাণ হারিয়েছে। ওই আত্মার অনুরোধেই জুলিয়ান তার আশ্রমে চাষ করা সবজির বিনিময়ে মানুষের কাছ থেকে নষ্ট পুতুল সংগ্রহ করতে থাকেন। জঙ্গলে এনে গাছের ডালের সঙ্গে এগুলো বেঁধে রাখলেই খুশি হতো শিশুটির আত্মা। এমনিভাবে হাজার হাজার কুড়িয়ে পাওয়া কিংবা কিনে আনা পুতুল দিয়েই জুলিয়ান গড়ে তোলেন মৃত পুতুলের দ্বীপ বা Island of the dolls কেও কেও বিশ্বাস করেন, দ্বীপটিতে এখনও মৃত শিশুটির আত্মা ঘোরাঘুরি করে। মাঝে মাঝে শোনা যায় ভুতুড়ে আওয়াজ। এতসব রহস্যের কারণেই ১৯৯০ সালে মেক্সিকান সরকার এই জোকিমিলকো জেলার এই দ্বীপটিকে National Heritage ঘোষণা করে। মেক্সিকান সরকার এই দ্বীপকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে পর্যটন অঞ্চল বানানোর উদ্যোগ নেয়। কিন্তু পর্যটকরা কদাকার পুতুল দেখে বোধ হয় রাতে দুঃস্বপ্ন দেখতে চান না। তাই তারা কখনও আসেন না। এই দ্বীপে একেক মৌসুমে বিশ-ত্রিশজনের বেশি পর্যটক কখনোই আসেননি।

এই দ্বীপের সর্বশেষ রহস্যজনক ঘটনা ঘটে ২০০১ সালের ২১ এপ্রিল। ওই দিন জুলিয়ান তার ভাইয়ের ছেলেকে নিয়ে সেই অপয়া খালটিতে মাছ ধরছিলেন। সে সময় তিনি ভাগ্নেকে বলেন, ‘পানির নিচ থেকে আমাকে কারা যেন ডাকছে! তাদের কাছে যাওয়ার জন্য আমাকে অনুরোধ করছে।’ কিছুদিন পরই ওই খাল থেকে উদ্ধার করা হয় জুলিয়ানের নিথর দেহ।

লক নেস হ্রদের জলদানব

লক নেস হ্রদ ঘিরেই কিংবদন্তির জলদানব ‘নেসি’র রহস্য অনেক পুরনো। ২০১১ সালের রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ায় স্কটল্যান্ডের লক নেস হ্রদে দুটি নৌকা হঠাৎ বিশাল এক ঢেউ এসে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পর এ জলদানব বিষয়ে আবারও কৌতূহল তৈরি হয়। গবেষকেরা এ জলদানবের কোন খোঁজ দিতে না পারলেও তাদের ধারণা এটা প্রাগৈতিহাসিক জলদানবের কাজ। গবেষকেরা এ প্রাণীটির অস্তিত্ব খুঁজতে দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছেন। এদেরই একজনড. রবার্ট রাইসন। রহস্যময় জলদানব নিয়ে তার অভিযানে ১৯৭২ সালে সূক্ষ্ম কিছু যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলেন। আগস্টের আট তারিখে তার দলের সদস্যরা নৌকায় অপেক্ষা করছিল। রাত একটার দিকে পর্যবেক্ষণে এক বিচিত্র প্রাণীর অস্তিত্ব ধরা পড়ে, যার রয়েছে বিরাট আকারের ডানা। লম্বায় সেই ডানা ছয় ফুটের মতো। ড. রাইনসের মতে, আজ থেকে সাত কোটি বছর আগে পৃথিবীতে এরকম প্রাণী ছিল। জাপানের টেলিভিশনের একদল কর্মী বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নিয়ে পানির নিচে অভিযান চালালো। একটি ডুবোজাহাজে করে নেমেছিল। ৯৫০ ফুট নিচে একটি গভীর গুহা আবিষ্কার করছিল তারা। তাদের ধারণা, ওই গুহটি ছিল সেই জলদানবের আশ্রয়স্থল। এর পরের বছর অভিযানে দলটি একটি প্রামাণ্য ছবি তুলল। তাতে দেখা গেল, বারো ফুট লম্বা লাল-খয়েরি রংয়ের একটি প্রাণী। তার মাথা দেখা যাচ্ছিল না। গলা ছিল ধনুকের মতো বাঁকা, আট ফুট লম্বা। অনেক প্রাণীবিজ্ঞানীর মতে, লক নেস হ্রদের রহস্যময় প্রাণীটি হল প্রাগৈতিহাসিক আমলের মৎস্যভোজী সরীসৃপ। এই জাতীয় প্রাণীর অস্তিত্ব সাত কোটি বছর আগে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল বলে সবার ধারণা ছিল। অনেকের মতে, ১০-১৫ হাজার বছর আগে বরফ যুগ শেষ হওয়ার সময় বরফ গলা পানির স্রোতে এই জাতীয় কিছু প্রাণী অন্য স্থান থেকে এই হ্রদে ভেসে চলে আসে। এ রহস্যময় প্রাণীটি নিয়ে অনেক রকম বর্ণনা করা হয়েছে। অনেকেই বলেছেন, এটা হাতির মতো মোটা। কেও বলেছেন, ত্রিশ ফুট লম্বা, পিঠে চারটি কুঁজ। কেও বলেছেন, মাথা সাপের মতো। প্রাচীন ইতিহাসে এ ধরনের কিছু জলদানবের বিবরণ পাওয়া যায়। এরকম করে বিশ্বজুড়ে অসংখ্য জলদানব দেখার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে নানা সময়ে। কে জানে হয়তো সত্যি সত্যি কোন একদিন জলদানবের দেখা মিলতেও পারে।

হুয়াং কুও শু জলপ্রপাত

বিখ্যাত জলপ্রপাত ‘হুয়াং কুও শু’ দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের কুইচৌতে অবস্থিত। চীনের স্থানীয় এক ধরনের বৃক্ষ ‘হুয়াং কুও শু’ নামানুসারে এই জলপ্রপাতটির নামকরণ করা হয়েছে। অন্য জলপ্রপাতের দৃশ্যের চেয়ে পর্যটকরা উপরে, নিচে, বামে, ডানে, সামনে ও পেছনে এই ছয়টি দিক থেকেই হুয়াং কুও শু জলপ্রপাতের সবসময়কার পরিবর্তিত দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। ঠিক এই অদ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যের কারণেই বিশ্বের বিখ্যাত জলপ্রপাতগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে সুন্দর ও মনোহর জলপ্রপাত বলে পরিচিত। হুয়াং কুও শু জলপ্রপাতকে কেন্দ্র হিসেবে এখানে বিভিন্ন আকারের আরও ১৮টি জলপ্রপাত রয়েছে। ফলে এ স্থানটি একটি বিরাট জলপ্রপাতের ‘পরিবারে’ পরিণত হয়েছে। এর সমন্বিত নাম হল ‘৯ পর্যায়ের ১৮ জলপ্রপাত’, সুন্দর এ দৃশ্য গ্রেট ওয়ার্ল্ড গিনিস সদর দফতর বিশ্বের বৃহত্তম জলপ্রপাত গ্রুপ বাছাই করার পাশাপাশি বিশ্ব গিনিস রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। হুয়াং কুও শু জলপ্রপাতটি খুবই দৃষ্টিনন্দন। এটি ১০১ মিটার চওড়া এবং ৭৭.৮ মিটার উঁচু। সারা বছরের চার ঋতুতেই এতে স্রোতের ধারা অব্যাহত থাকে। হুয়াং কুও শু দর্শনীয় স্থানে সারি সারি নীল পাহাড় ও বিস্ময়কর সব পাথর দাঁড়িয়ে রয়েছে। নদীর স্বচ্ছ পানি মাঝে মাঝে পাহাড়গুলো দিয়ে বয়ে যায়। কখনও কখনও ভূমির নিচের প্রান্ত ছুঁয়ে যায়। ফলে এক একটি ভূগর্ভস্থ নদীর সৃষ্টি হয়েছে।

সুন্দর জলাভূমি নামুসিলাই

নামুসিলাই চীনের লিয়াওনিং প্রদেশের চাং উ জেলার উত্তরপূর্বাঞ্চল ও কেরচিন মরুভূমির দক্ষিণ দিকে অবস্থিত অর্ধেক বালি ও খরা অঞ্চল। পরবর্তী সময় এ অঞ্চলে একটি প্রাকৃতিক জলাভূমি সংরক্ষণ এলাকা হিসেবে নির্মিত হয়েছে। এটি নামুসিলাই প্রাকৃতিক সংরক্ষণ এলাকা নামেই পরিচিত। স্থানীয় অঞ্চলের অধিবাসীরা একে লিয়ানহুয়া পাও বলে ডাকে। আঞ্চলিক ভাষায় পাওজি’র অর্থ হল ছোট হ্রদ। এই হ্রদটির আয়তন খুব বড় নয়। তবে এটি হচ্ছে কেরচিন মরুভূমির কেন্দ্রীয় স্থান। শেনইয়াং শহর থেকে ৫-৬ ঘণ্টার গাড়ি করে চাংউ জেলার হৌমা গ্রামে নামুসিলাই প্রাকৃতিক সংরক্ষণ এলাকার পৌছা যায়। হৌমা গ্রাম থেকে প্রাকৃতিক সংরক্ষণ এলাকাটি প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে। এই প্রাকৃতিক এলাকাটি কয়েকটি অংশ নিয়ে গঠিত। কেন্দ্রীয় অঞ্চলে পশুপালন নিষিদ্ধ এবং দর্শনার্থীদের প্রবেশ সংরক্ষিত। এখানে উদ্ভিদ প্রাকৃতিকভাবে বৃদ্ধি পায়। এখানকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্য হচ্ছে হ্রদের পদ্মফুল। এ পদ্মফুল হচ্ছে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের উদ্ভিদ, যা কেবল এই হ্রদেই বেঁচে থাকতে পারে। হ্রদের ১০০ একর থেকে ৬০০ একর এলাকা জুড়ে রয়েছে এই পদ্ম। এখনকার জলাভূমিতে অনেক পাখি ও বন্যপ্রাণীর বসবাস করে। ঈগল থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকমের পাখির বসবাস রয়েছে এই অঞ্চলে। বহু বছরের সংরক্ষণের পরও গ্রীষ্মকালে এখানকার দৃশ্য খুব সুন্দর এবং জীবের বসবসা আগের তুলনায় অনেক বেশি। নিবিড় নলখাগড়া ও পদ্মফুল আর পাখির মিষ্টি কণ্ঠের গান কেরচিন মরুভূমিকে মনোরম করে তোলে। বর্তমানে এখানকার দৃশ্য আরও সুন্দর। এ জলাভূমি হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম সুন্দরময় স্থান। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। তাই এই সৌন্দর্যকে রক্ষা করার জন্য কর্তৃপক্ষ বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...