শিক্ষাপদ্ধতি সঠিক হলে শিক্ষার মানও সঠিক থাকে

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ শিক্ষার মান বা পদ্ধতি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী তথা সরকার নিজের সাফাই গাইবে এইটাই স্বাভাবিক। শিক্ষা মন্ত্রী হলেই যে শিক্ষিতের মত কথা বলবে এমনটা আশা করার কোন অবকাশ নাই। শিক্ষিত ব্যক্তি আর জ্ঞানী ব্যক্তি এক জিনিষ নয়। কোন জ্ঞানী ব্যক্তির হাতে গোটা জাতির শিক্ষার ভার থাকলে সেটা একটা আশীর্বাদ। লিখেছেন শফি আহমেদ।


quality system of education

আমি শিক্ষাপদ্ধতি ও শিক্ষার মানের ব্যপারে একটি অংশের দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেষ্টা করবো। দৃষ্টি দেওয়া না দেওয়া একান্ত আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার । তবে এইখান থেকে শিক্ষার মানের অপূর্ণতার একটা আভাস পাওয়া সম্ভব । আমারা যারা ২০১৪ সালের মধ্যে এইচ.এস.সি. পাস করে ফেলেছি তাদের অনেকের কাছেই একটি তথ্য অজানা থাকতে পারে। আপনার আমার সময়ে এইচ.এস.সি. তে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নামে কোন বিষয় ছিলোনা । হয়তোবা দরকারও ছিলোনা। এখন বিষয়টির দরকার আছে। সত্যিই দরকার আছে। কেন দরকার আছে এমন দুই একটা বিষয় তুলে ধরি।

বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। এখন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। আমার মনে হয় পদার্থ, রসায়ন, ভূগোল, দর্শন, ফিনান্স ইত্যাদি বিষয়ের পুস্তকি জ্ঞান আমাদের প্রত্যহিক জীবনে যতটা না প্রভাব বিস্তার করে তার চেয়ে বেশী প্রভাব বিস্তার করে মোবাইল, ইন্টারনেট, টেলিভিশন, কম্পিউটার ইত্যাদি । অনেকেই জানেন ট্রেনের টিকেট এখন অনলাইন সিস্টেমে চলে গেছে। কখনো যদি ট্রেনের টিকেট কাউন্টারে যান তবে দেখতে পাবেন আমাদের চাকুরীরত ভাই বোন গুলো কম্পিউটারে টিকেট প্রিন্ট করে দিতে কতটা দক্ষ! সরকারী ব্যাংকের পুরনো কর্মচারীরা কেমন দ্রুত কম্পিউটারে কাজ করতে পারে। আপনি যদি নিজে কম্পিউটার ব্যবহারে একটু দক্ষ হন তবেই বুঝতে পারবেন তাদের দুর্বলতা কতখানি। আমাদের অনেকগুলো সরকারী ও বেসরকারী চাকুরীর আবেদেন করতে হয় অনলাইনে। দেখে খুব মজা লাগে স্নাতোক পাস করা ছেলে মেয়েরা হাতের কাছে ইন্টারনেট কম্পিউটার থাকার পরও দৌড় দেয় কম্পিউটার অপারেটরদের দোকানে। ওই দোকানগুলোতে সাইনবোর্ড টাঙানো থাকে, “চাকরীর আবেদন ফর্ম পূরণ করা হয় মাত্র ৩০/৪০/৫০ টাকাতে”। অনেককে দেখেছি যে তারা ধুমছে ফেসবুক ব্যবহার করছে, কিন্তু জানেনা ব্রাউজার কি, URL/Link কি। কম্পিউটার থাকার পরও জানেনা অপারেটিং সিস্টেম কি, ইউটিলিটি সফটওয়্যার কোনগুলো। এমন উদাহরণ আরও দেওয়া যাবে। কিন্তু উদাহরণ দেবার দরকার নাই। নতুন প্রযুক্তির সাথে আমার কেমন অভ্যস্ত তা আমারা কম বেশী সবাই জানি। তবে আশার কথা আমরা খুব দ্রুত শিখে ফেলছি। এই কম জানা লোকগুলোকে মোটেও দোষ দেওয়া যাবেনা। কারণ বাংলাদেশে এই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে বিগত ১০-১৫ বছরে। আমার খুব মনে আছে ২০০১/২০০২ সালের দিকেও সবার হাতে হাতে মোবাইল ফোন ছিলোনা। ইন্টারনেট এলো তারও পরে (যদিও ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে প্রথম ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু হয়, কিন্তু তা এতটা সহজলভ্য ছিলোনা)। কম্পিউটারও এতো সস্তা জিনিষ ছিলোনা। আমরা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খুব দ্রুতগতিতে গ্রহণ করছি এবং বলবো সফলভাবেই করছি। বাংলাদেশ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্যের দিকে ধাবমান। (সফলতার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে হয়তো আরে একদিন আলোচনা করা যাবে)। আরও সফলতার জন্যে আমাদের প্রয়োজন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে দক্ষ একটি নতুন প্রজন্ম। আর এর জন্য এইচ.এস.সি. তে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়টার প্রয়োজনীয়তাটা অস্বীকার করা সম্ভব না। আর এই প্রয়োজনীয়তা থেকে এই বিষয়টি বিজ্ঞান, মানবিক, ব্যবসা সকল বিভাগের শিক্ষার্থীর জন্যে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সেটাও ঠিক আছে। শুধু বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা এই ক্ষেত্রে দক্ষ হলে চলবেনা।

ভুমিকা মনে হয় একটু বেশী হয়ে গেলো। এইবার আসি সমস্যাটা কোথায় সেখানে।

quality system of education-2

প্রায় দেড় বছর হয়ে গেলো, বিষয়টি উচ্চমাধ্যমিক স্তরে যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু কলেজ গুলোতে এই বিষয়টির কোন শিক্ষক নেই। কিছু বেসরকারী কলেজে শিক্ষক থাকলেও সরকারী একটি কলেজেও বিষয়টির কোন শিক্ষক নেই। কেন বলছি, “সরকারী একটি কলেজেও বিষয়টির কোন শিক্ষক নেই” কারণ টা হলো- আমাদের হয়তো জানা আছে সরকারী কলেজের শিক্ষক হতে হলে বি.সি.এস. ক্যাডার (শিক্ষা) হতে হয়। কিন্তু বি.সি.এস. শিক্ষা ক্যাডারে এই বিষয়টির কোন পদ নাই। তাহলে কলেজগুলোতে কিভাবে পাঠদান হচ্ছে। কিভাবে ২০১৫ সালের পরীক্ষার্থীরা এই বিষয়ে পরীক্ষা দিবে? আমার জানা একটি সরকারী কলেজে (নাম বলছিনা) আজ অবধি এই বিষয়টির উল্লেখযোগ্য কোন ক্লাস হয়নি। হয়নি সঠিকভাবে ব্যবহারিক ক্লাস। তাহলে এই ছাত্র-ছাত্রীরা ২০১৫ সালের পরীক্ষাতে কিভাবে এই বিষয়ে পাস করবে? আবার A+ ও পাবে?

পাস করুক বা A+ পাক, এতে আমার কোন অ্যালার্জি নাই। কারণ অনেকেই নিজ উদ্যোগে স্যার খুঁজে নিয়েছে। কেও পড়ছে তার বড় ভাই এর কাছে, কেও মামা, কেওবা চাচাদের কাছে পড়ছে, যারা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বা কম্পিউটার সায়েন্সে গ্রাজুয়েশন করেছে। আবার কিছু কিছু জায়গাতে বিভিন্ন বিষয়ের স্যাররা সুন্দর ফাঁদ পেতেছেন। পদার্থ, রসায়ন, ম্যাথ এমনকি বাংলা ইংরেজীর স্যাররাও কোথাও কোথাও এই বিষয়টির প্রাইভেট পড়াচ্ছেন। না জেনে শিক্ষার্থীরাও ফাঁদে পা দিচ্ছে। তারপরও কোথাও না কোথাও কোন না কোনভাবে এই বিষয়টির পাঠদান কিন্তু চলছে। তাই অনেক শিক্ষার্থী পাস করবে, A+ ও পাবে।

কিন্তু সরকার তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কি উচিত ছিলোনা এই বিষয়ে আলোকপাত করা? উচিত ছিলোনা কি এই শিক্ষার্থীদের একটি বিষয় দায় সারাভাবে চাপিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকার? উচিত ছিলোনা কি, শুরুতে শিক্ষক না থাকলেও ৩৫ তম বি.সি.এস. এ এই বিষয়টির জন্যে শিক্ষা ক্যাডারে পদ সৃষ্টি করা? না, তারা সেটা করেনি। তবে কি ভাবা হচ্ছে অন্য কোন বিষয়ের কিছু স্যারকে ১/২ মাসের ট্রেনিং দিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে পণ্ডিত বানানো হবে? যদি তাই হয় তাহলে বাংলার স্যারকে ট্রেনিং দিয়ে পদার্থের, পদার্থের স্যারকে ট্রেনিং দিয়ে জীব বিজ্ঞানের, ব্যবস্থানপনার স্যারকে ইংরেজীর পণ্ডিত ইত্যাদি ইত্যাদি বানায়ে ফেললে কিন্তু মন্দ হয়না। সব স্যার এক একটা অল রাউন্ডার। ভাবতেই ভালো লাগছে। অকারণে বি.সি.এস. এ শিক্ষা ক্যাডারের দরকার টা কি? বি.সি.এস. শিক্ষা ক্যাডারে যখন সার্কুলার হয় তখন পদার্থ, রসায়ন, জীব বিজ্ঞান, গনিত, ইংরেজি, ফিনান্স, ব্যবস্থাপনা, ইতিহাস, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা চাওয়া হয় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতোক/স্নাতোকত্তর ডিগ্রী। কেন? কারণ এইসব বিষয়ে তাদের জ্ঞান অন্যদের চেয়ে অবশ্যয় বেশী। তাহলে কেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতোক/স্নাতোকত্তর ডিগ্রী হয়নি? নাকি ভাবা হচ্ছে , যেনোতেনোভাবে পরীক্ষা নিতে পারলেই হয়। শিক্ষার্থীদের A+ দেওয়ার বিষয়টা তো আমাদের হাতেই আছে। আচ্ছা , শিক্ষক নাই তাহলে খাতা দেখবে কারা? আরে দেখলেই হলো। খাতাতে নম্বর দিতে কি মহাপণ্ডিত হতে হয় নাকি? দিয়ে দিবে ৭০-৯০ এর মধ্যে একটা নাম্বার।

ধরুন ২০১৫ সালের এইচ.এস.সি. পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হলো , এইবার শিক্ষামন্ত্রীকে আমার প্রশ্ন আচ্ছা, কলেজগুলোতে শিক্ষক না থাকার পরও কিভাবে ২০১৫ সালের এইচ.এস.সি. পরীক্ষাতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে পরীক্ষার্থীরা পাস করলো? কিভাবে এতো এতো A+ পেলো ? এই বিষয়ে স্নাতক/স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারী লোকবল না থাকার পরও প্রশ্নপত্র কারা তৈরি করেছেন? শিক্ষক না থাকার পরও কারা খাতা দেখলো? যোগ্য শিক্ষকহীনভাবেও একটি বিষয় কিভাবে এতদিন পাঠ্য বিষয়সমূহের অন্তর্গত থাকলো? কেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় বি.প.এস.সি. এর কাছে শিক্ষক-এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেনি? ইত্যাদি ইত্যাদি।

কলেজগুলোতে শিক্ষক না থাকলেও কিন্তু অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়েই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে অভিজ্ঞ শিক্ষক রয়েছেন। ভর্তি পরীক্ষাতে যদি তারা এই বিষয় থেকে প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করেন তবে তাতে কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ থাকবেনা। তারা ঠিকই ভর্তি পরীক্ষার স্ট্যান্ডার্ডে প্রশ্ন করবে। তখন কি আবার ভর্তি পরীক্ষাতে পাসের হারের বেহাল দশা হবেনা?

তখন কি আবার শিক্ষামন্ত্রীকে নিজের আর সরকারের সাফাই গাইতে দেখতে হবে? আমি তাকে অনুরোধ করবো তিনি যেন এই প্রশ্নগুলোর যুক্তিপূর্ণ উত্তর আগে থেকেই তৈরি করে রাখেন, তানাহলে উনারে আবার ‘শিক্ষিত মূর্খ’ বলে মনে হলে আমাকে দোষ দিতে পারবেননা। তখন আমি বলতেই পারি যে , “মন্ত্রী শিক্ষার হলেই যে শিক্ষিতের মত কথা বলবে এমনটা আশা করার কোন অবকাশ নাই। শিক্ষিত ব্যক্তি আর জ্ঞানী ব্যক্তি এক জিনিষ নয়। কোন জ্ঞানী ব্যক্তির হাতে গোটা জাতির শিক্ষার ভার থাকলে সেটা একটা আশীর্বাদ।”

শিক্ষাপদ্ধতি সঠিক হলে শিক্ষারমান আপনা আপনি ভালো হয়ে যায়। আর শিক্ষাপদ্ধতিতে গলদ থাকলে তখন শিক্ষারমানকে হাতে ধরে বা গলাবাজি করে উন্নত করতে হয়।

লিখেছেন শফি আহমেদ।

Advertisements
Loading...