শিশুর মাথা কেটে মিছিল করে এ কেমন উৎসব?

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ শিশুর মাথা কেটে মিছিল করে এ কেমন উৎসব করছে ওরা? ‘গাজন বা চড়ক’ নামে এটিকে লোকাচার বা লোকসংস্কৃতি বলা হয়।

baby's head

পৃথিবীতে এখন এই যুগেও ঘটে থাকে সব লোমহর্ষক ঘটনা। যেসব কাহিনী শুনলে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনই একটি কাহিনী সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের একটি গ্রামে শিবের গাজন পালনের লোমহর্ষক এই বর্ণনা দিয়েছেন সে দেশের এক লেখক শান্তনু গাঙ্গুলি। সেই লেখাটি প্রকাশ করা হলো।

প্রকৃতপক্ষে ‘গাজন বা চড়ক’ একটি লোকাচার বা লোকসংস্কৃতি। এরমূল কথা হলো, জগৎ-সংসারকে ভোগ করতে হলে ত্যাগের মাধ্যমেই তার রসাস্বাদন করতে হয়। তাই প্রাচীনকাল হতেই বাঙালিরা ফাগুন দিনের ফাল্গুনী রচনা করে রাধাকৃষ্ণকে সাক্ষী রেখে চৈত্রমাসে শিবের সাধনা করেন। স্থান কাল ভেদে কেও বলতো শিবের গাজন, আবার কেও বলতো নীলের গাজন।

হাল্কা আর সুগন্ধি ধুনোর ধোঁয়া, তারমধ্যেই দেখা গেলো একটা লোক গাছ হতে একটা নোংরা চটের বস্তা নামিয়ে আনছে। প্রচুর মানুষ সেখানে ভিড় করে রয়েছে। কাছে যেতে একটা তীব্র দুর্গন্ধ। বস্তা হতে বেরোল কয়েক দিন আগে মারা যাওয়া ‘মানুষ’-এর পচাগলা দেহ ও দেহাংশ; বিশেষত কাটা মাথা। একটা শিশুর মৃতদেহও বার করা হলো; মাংস গলে-গলে পড়ছে।

ওই দেহ এবং দেহাংশ দড়িতে বেঁধে গোটা গ্রামে উল্লাস করতে-করতে ঘুরবে কিছু মানুষ! এরা নাকি পুণ্যলোভী মানুষ। আবার এদেরকে বলা হয় ‘সন্ন্যাসী’। এটি আসলে হিন্দু ধর্মীয় একটি আচার-আচরণ। চৈত্র সংক্রান্তি‚ অর্থাৎ চৈত্র মাসের শেষ দিন পালিত হয়ে থাকে এই শিবের গাজন উৎসব। শিবের গাজন অনেক জায়গাতেই হয়। কিন্তু বর্ধমান কুড়মুন গ্রামের গাজন একটু অন্যরকমভাবে পালিত হয়ে থাকে। একইভাবে হয় পার্শ্ববর্তী পলাশী‚ নাসিগ্রাম‚ ভাণ্ডারডিহিসহ আরও বেশ কয়েকটি গ্রামে। কিন্ত ভয়াবহতার দিক হতে কুড়মুন এদের সবগুলোকে ছাপিয়ে যায়। আর তাই কুড়মুনের গাজন সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত (কুখ্যাত বলাই ভালো)। এটি আসলে পৈশাচিক গাজন বা রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা।

জানা যায়, হিন্দু লোকাচারে গাজনের রীতি খুবই পুরোনো একটি রীতি। প্রচলিত মতবাদ অনুয়ারী‚ গাজনের সন্ন্যাসীরা (এরা বেশিরভাগ শুধু চৈত্র মাসের জন্য ‘সন্ন্যাস’ নেন) চৈত্র সংক্রান্তিতে ভূত বা শিবের শিষ্য হয়ে যান। তারা বিশ্বাস করেন‚ মৃতদেহ বা দেহাংশের মধ্যে তখন যার দেহ; তার আত্মা ফিরে আসে। তাই শিবের শিষ্য নন্দি-ভৃঙ্গির অনুকরণে চলে এমন পিশাচ-তাণ্ডব। যদিও এই বিষয়ে ব্যাপক মতপার্থক্য রয়েছে।

জানা যায়, বছর দুয়েক আগে বর্ধমান জেলার শক্তিগড়ে পুলিশ ৮ জনকে গ্রেফতার করে। অভিযোগ ছিল‚ গাজনের জন্য এই সন্ন্যাসীরা মৃতদেহ চুরি করে আনছিলেন। রাস্তায় দুর্গন্ধে সন্দেহ হয় ও তারা পুলিশে খবর দেন। সে বছর গাজনের আনন্দ উৎসব একটু কম হয়। মৃতদেহের যোগানের কারণে কখনও এই উৎসব বন্ধ হবে না।

জানা যায় আগে নাকি আরও বেশি মৃতদেহ থাকতো। এর কারণ হলো সেই সময় বসন্ত রোগে প্রচুর মানুষ মারা যেতো। শোনা যায়‚ একটি শিশু নাকি মারা যায়। তার বাড়ির লোক কোনোরকম আওয়াজ না করে রাতের অন্ধকারে শবদেহটি দূরের একটি গ্রামে কবর দিয়ে আসে (হিন্দু ধর্মানুসারে বয়স পাঁচ বছরের কম বয়স হলে তাকে দাহ করার বদলে কবর দেয়ার রীতি রয়েছে)। এটি পুজো উদ্যোক্তারা কোনোভাবে জানতে পেরে যান। তখন ওই শিশুটিকে কবর হতে তুলে আনেন। তবে এমন ঘটনার কথা শুনে সত্যিই আশ্চর্য না হয়ে পারা যায় না। এখনকার এই সভ্য সমাজেও অসভ্যের মতো কাজ করা হয় ধর্মের নাম করে। এসব অনাচার কবে দূর হবে তা কেও বলতে পারে না।

Advertisements
Loading...