The Dhaka Times
তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে রাখার প্রত্যয়ে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ম্যাগাজিন।

সাদ্দামের ফাঁসির আগে যেসব মার্কিন সৈন্যরা বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন

জীবনের ওই শেষ দিনগুলোতে তাকে পাহারা দিয়েছিলেন ১২ জন মার্কিন সৈন্য

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ সাদ্দামকে ফাঁসি কাষ্ঠে উঠিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। সাদ্দামের মৃত্যুর পর তার সঙ্গে থাকা মার্কিন প্রহরীরা হৃদয়গ্রাহী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সাদ্দামের নিরাপত্তায় থাকা প্রহরীরা সাদ্দামের মৃত্যুর পর কেও কেও কেঁদেছেন!

২০০৪ সালের জুন মাসে সাদ্দাম হোসেনকে ইরাকি অন্তবর্তী সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হয় বিচারের জন্য। এর আগে
ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ২০০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে মার্কিন বাহিনী লুকিয়ে থাকা এক গোহা থেকে গ্রেফতার করে। তারপর ২০০৪ সালের জুন মাসে তাকে ইরাকের অন্তবর্তী সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হয় বিচারের জন্য। জীবনের ওই শেষ দিনগুলোতে তাকে পাহারা দিয়েছিলেন ১২ জন মার্কিন সৈন্য। ওইসব সৈন্যদের সে সময়ের নানা কাহিনী তুলে ধরেছে বিবিসি।

যদিও গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে ওইসব সৈন্যরা সাদ্দাম হোসেনের ‘বন্ধু’ ছিলেন, তা কিন্তু মোটেই নয়। তবে ওই ১২ জন আমেরিকান সৈন্য সাদ্দামের শেষ সময়ের বন্ধু হয়ে উঠেন। আক্ষরিক অর্থেই শেষ মুহূর্ত অবধি তারাই ছিলেন সাদ্দামের জীবন সঙ্গি।

জানা যায় যে, মার্কিন ৫৫১ নম্বর মিলিটারি পুলিশ কোম্পানির ওই ১২ জন সেনাসদস্যকে মূলত ‘সুপার টুয়েলভ’ বলে ডাকা হতো।

তাদেরই একজন হলেন উইল বার্ডেনওয়ার্পার। তিনি একটি বই লিখেছেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘দা প্রিজনার ইন হিজ প্যালেস, হিজ অ্যামেরিকান গার্ডস, অ্যান্ড হোয়াট হিস্ট্রি লেফট আনসেইড’। বাংলা করলে বইটির নাম হতো ‘নিজের প্রাসাদেই এক বন্দী, তার আমেরিকান প্রহরী- ইতিহাস যে কথা কখনও বলেনি’। বইটি জুড়ে রয়েছে সাদ্দাম হোসেনকে তার শেষ সময় পর্যন্ত সুরক্ষা দেওয়ার নানা অভিজ্ঞতার কথা।

মি. বার্ডেনওয়ার্পার স্বীকার করেছেন যে, তারা যখন সাদ্দাম হোসেনকে জল্লাদদের হাতে তুলে দেন ফাঁসির জন্য, তখন তাদের ১২ জনেরই চোখেই পানি এসে গিয়েছিল।

সাদ্দামকে দাদুর মতো দেখতে লাগতো

বার্ডেনওয়ার্পার তারই এক সেনা-সঙ্গী রজারসনকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন যে, ‘আমরা কখনই সাদ্দামকে মানসিক বিকারগ্রস্ত হত্যাকারী হিসাবে দেখিনি। তার দিকে তাকালে নিজের দাদুর মতোই লাগতো অনেক সময়।’

ইরাকের জেল জীবনের শেষ সময়টুকু কাটানোর সময় সাদ্দাম হোসেন আমেরিকান গায়িকা মেরি জে ব্লাইজার গান শুনতেন নিয়মিতভাবে। নিজের এক্সারসাইজ বাইকে চড়তে পছন্দ করতেন সাদ্দাম হোসেন। তিনি ওটার নাম দিয়েছিলেন ‘পনি’। সাদ্দাম হোসেন মিষ্টি খেতে খুব ভালোবাসতেন।

বার্ডেনওয়ার্পার আরও লিখেছেন, নিজের জীবনের শেষ দিনগুলোতে সাদ্দাম হোসেন তাদের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করতেন। ওই ব্যবহার দেখে বোঝাই যেতো না যে সাদ্দাম হোসেন কোনও এক সময় একজন অত্যন্ত নিষ্ঠুর শাসক ছিলেন।

তাকে সিগার খেতে শিখিয়েছিলেন কাস্ত্রো

সাদ্দাম হোসেনের ‘কোহিবা’ সিগার খাওয়ার খুব নেশা ছিল। মনে করা হয় কিউবার সিগারের মধ্যে এই ‘কোহিবা’ সবার চেয়ে সেরা সিগারগুলোর অন্যতম বলে খ্যাতি রয়েছে। ভেজা ওয়াইপে জড়িয়ে একটা বাক্সের মধ্যে রাখা থাকতো তার সিগারগুলো। সাদ্দাম হোসেন নিজেই বলেছিলেন যে, বহু বছর পূর্বে ফিদেল কাস্ত্রো তাকে সিগার খাওয়া শিখিয়েছিলেন।

সিগার ছাড়াও বাগান করা আরেকটা শখ ছিল সাদ্দামের। জেলের ভেতরে অযত্নে ফুটে থাকা জংলী ঝোপঝাড়গুলোকেও সাদ্দাম হোসেন একটা সুন্দর ফুলের মতো মনে করতেন।

খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারেও খুবই সংবেদনশীল ছিলেন সাদ্দাম হোসেন। সকালের নাস্তাটা তিনি কয়েকটা ভাগে খেতেন – প্রথমে অমলেট, তারপর মাফিন এবং শেষে তাজা ফল। ভুল করেও যদি তাঁর অমলেটটা টুকরো হয়ে যেতো, তখন সেটা তিনি খেতে অস্বীকার করতেন।

বার্ডেনওয়ার্পার স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে আরও লিখেছেন, একবার সাদ্দাম তার ছেলে উদয় কতোটা নিষ্ঠুর ছিল, সেটা বোঝাতে গিয়ে বীভৎস একটা ঘটনার কথা বলেন। ওই ব্যাপারটাতে সাদ্দাম হোসেন প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলেন।

উদয় কোনও একটা পার্টিতে গিয়ে গুলি চালিয়েছিল- তাতে বেশ কয়েকজন মারা যায়। গুলিতে আহত হন আরও কয়েকজন।

সাদ্দাম বিষয়টি জানতে পেরে নির্দেশ দিয়েছিলেন উদয়ের সবক’টা গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিতে। ওই ঘটনাটির কথা বলতে গিয়ে সেনা প্রহরীদের সাদ্দাম ভীষণ রেগে গিয়ে শুনিয়েছিলেন উদয়ের দামী রোলস রয়েস, ফেরারি, পোর্শা গাড়িগুলোতে তিনি আগুন লাগিয়ে দেন।

ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদে প্রতিক্রিয়া

সাদ্দাম হোসেনের নিরাপত্তায় নিযুক্ত আমেরিকান সেনারাই একদিন সাদ্দামকে জানিয়েছিলেন যে তার ভাই মারা গেছেন। যে সেনাসদস্য খবরটা দিয়েছিলেন, সাদ্দাম তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘আজ হতে তুমিই আমার ভাই।’

আরেকজন প্রহরীকে সাদ্দাম বলেছিলেন, ‘যদি আমার সম্পত্তি ব্যবহার করার অনুমতি পাই, তাহলে তোমার ছেলের কলেজে পড়তে যা খরচ লাগবে, সব আমি দিতে রাজী আছি।’

এক রাতে বছর কুড়ি বয়সের এক সেনা প্রহরী ডসন বাজে মাপে কাটা একটা স্যুট পড়ে ঘুরছিল। পরে জানা গেলো যে, ডসনকে ওই স্যুটটা সাদ্দাম হোসেন উপহার হিসাবে দিয়েছেন।

বার্ডেনওয়ার্পারের বক্তব্যে পাওয়া যায়, ‘বেশ কয়েকদিন আমরা সবাই ডসনকে নিয়ে হাসাহাসি করছিলাম ওই স্যুটের জন্য। ওটা পড়ে ও এমনভাবে হাঁটাচলা করতো, যেনো মনে হতো কোনও ফ্যাশন শো’য়ে ক্যাটওয়াক করছে ডসন।’

ক্রমেই সাদ্দাম হোসেন ও তার প্রহরীদের মধ্যে বন্ধুত্ব বেশ ঘন হয়ে উঠছিল, যদিও তাদের ওপর কড়া নির্দেশ ছিল যে সাদ্দামের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টাও যেনো কোনো অবস্থাতেই কেও না করে।

সাদ্দামকে মামলা চলাকালীন সময় দুটো জেলে রাখা হয়। এক জেল ছিল আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের কয়েদখানা, অন্যটা উত্তর বাগদাদের সাদ্দামেরই একটি প্রাসাদে। ওই প্রাসাদটা ছিল একটা দ্বীপের মতো। একটা সেতু পেরিয়ে তবেই ওই দ্বীপে যেতে হতো।

বার্ডেনওয়ার্পার লিখেছেন, ‘আমরা অবশ্য সাদ্দাম হোসেনকে এমন কিছু দিইনি, যেটা তিনি পাওয়ার অধিকারী ছিলেন না। তবে ওঁর অহংবোধে কখনও আঘাত করতাম না আমরা কখনও,’।

স্টিভ হাচিনসন, ক্রিস টাস্করের মতো কয়েকজন প্রহরী ওই প্রাসাদেরই একটা স্টোর রুমে সাদ্দামের দপ্তর তৈরি করে রেখেছিল।

সাদ্দাম হোসেনের দরবার

সাদ্দাম হোসেনকে একটিচমক দেওয়ার ইচ্ছা ছিল সকলের। পুরনো, ফেলে দেওয়া জিনিসপত্র হতে একটা ছোট টেবিল ও চামড়ার ঢাকনা দেওয়া একটা চেয়ার নিয়ে আসা হয়। টেবিলের ওপর ইরাকের একটা ছোট পতাকাও রাখা হয়।

বার্ডেনওয়ার্পার আরও লিখেছেন, ‘আমরা চেষ্টা করেছিলাম জেলের ভেতরেই সাদ্দামের জন্য শাসনকাজ পরিচালনার মতো একটা অফিস তৈরি করে দিতে। যখন সাদ্দাম ওই ঘরটায় প্রথমবার গিয়েছিলেন, একজন সেনা সদস্য হঠাৎই খেয়াল করে যে টেবিলের ওপর অনেক ধুলো জমে রয়েছে। সে ধুলো ঝাড়তে শুরু করেছিল।’

সে সময় ওই আচরণটা সাদ্দামের নজর এড়ায়নি। চেয়ারে বসতে বসতে সাদ্দাম মুচকি হেসেছিলেন।

তারপর হতে তিনি রোজ ওই চেয়ারে এসে বসতেন। সাদ্দামের নিরাপত্তার জন্য নিযুক্ত সেনাপ্রহরীরা সবাই সামনের চেয়ারগুলোতে বসতেন। মনে হতো যেনো সাদ্দাম নিজের দরবারে বসেছেন।

নিরাপত্তা রক্ষীরা সব সময় চেষ্টা করতো সাদ্দামকে খুশী রাখতে। তার বদলে সাদ্দামও সকলের সঙ্গে হাসি-মস্করাও করতেন।

কয়েকজন রক্ষী পরে বার্ডেনওয়ার্পারকে বলেছিলেন যে, তারা বিশ্বাস করতেন ‘যদি তাদের কোনও ঝামেলায় পড়তে হয়, তাহলে সাদ্দাম হোসেন তাদের বাঁচানোর জন্য নিজের জীবনও বাজি রাখতে পারেন’।

যখন সময়-সুযোগ পেতেন, তখনই সাদ্দাম হোসেন পাহারার দায়িত্বে থাকা রক্ষীদের পরিবারের খোঁজ-খবর করতেন।

বার্ডেনওয়ার্পারের বইটাতে সবথেকে আশ্চর্যজনক যে বিষয়টার উল্লেখ রয়েছে, সেটা হলো সাদ্দামের মৃত্যুর পর তার প্রহরীরা রীতিমতো শোক পালন করেন, যদিও সাদ্দাম আমেরিকার কট্টর শত্রু ছিলেন।

প্রহরীদেরই একজন হলেন অ্যাডাম রজারসন উইল বার্ডেনওয়ার্পারকে বলেছিলেন যে, ‘সাদ্দামের ফাঁসি হয়ে যাওয়ার পরে আমার মনে হচ্ছে আমরা তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। নিজেদেরই এখন তার হত্যাকারী বলে মনে হয়েছে। এমন একজনকে মেরে ফেললাম আমরা, তিনি আসলে আমাদের খুব আপনজন ছিলেন।’

সাদ্দাম হোসেনের ফাঁসির পর যখন তার মরদেহ বাইরে নিয়ে আসা হয়, তখন সেখানে জমা হওয়া লোকজন মৃতদেহের ওপর থুতু দিয়েছিল। ওই ঘটনা দেখার পর হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল আমেরিকান সেনারা!

বার্ডেনওয়ার্পার লিখেছেন, ওই নোংরামি দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন তারা সকলেই, বিশেষ করে যে ১২ জন তার শেষ সময় নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।

তাদের মধ্যে একজন ওখানে জমায়েত হওয়া লোকজনের কাছে হাত জোড় করে তাদের থামাতে চেষ্টা করেন। তবে দলের বাকিরা তাকে টেনে সরিয়ে নিয়ে যায়।

ওই ১২ জনের অন্যতম হলেন স্টিভ হাচিনসন সাদ্দামের ফাঁসির পরেই আমেরিকার সেনাবাহিনী হতে ইস্তফা দেন।

হাচিনসন বর্তমানে জর্জিয়ায় বন্দুক চালনা ও ট্যাকনিক্যাল ট্রেনিং দেওয়ার কাজ করেন। তার মনেও এখনও ক্ষোভ রয়েছে, কারণ সেদিন যেসব ইরাকী সাদ্দাম হোসেনের মৃতদেহকে অপমান করছিল, তাদের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে না পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তদের। তবে সাদ্দাম হোসেন শেষ দিন পর্যন্ত আশা করতেন যে তার হয়তো ফাঁসি হবে না।

একজন রক্ষী, অ্যাডাম রোজারসন বার্ডেনওয়ার্পারকে বলেছিলেন যে, কোনও এক নারীর সঙ্গে প্রেম করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন সাদ্দাম হোসেন। জেল হতে ছাড়া পাওয়ার পর আবারও বিয়ে করার ইচ্ছা হয়েছিল তার।

২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনটে নাগাদ ঘুম হতে ডেকে তোলা হয়েছিল সাদ্দাম হোসেনকে। তাকে জানানো হয় যে কিছুক্ষণের মধ্যেই ফাঁসি দেওয়া হবে তাকে। এই কথাটা শোনার পর সাদ্দামের ভেতরের সব বিশ্বাসই যেনো ভেঙ্গে পড়েছিল। তিনি চুপচাপ গোসল করে ফাঁসির জন্য তৈরি হয়ে নেন।

সেই সময়েও তার একটা ভাবনা জাগে। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, ‘সুপার টুয়েলভের সদস্যরাও কি ঘুমোচ্ছে?’

ফাঁসির কয়েক মিনিট আগে স্টিভ হাচিনসনকে কারাকক্ষের বাইরে ডেকে পাঠিয়েছিলেন সাদ্দাম হোসেন। লোহার শিকগুলোর মধ্যেদিয়ে হাত বাড়িয়ে নিজের রেমন্ড ওয়েইল হাতঘড়িটা দিয়ে দেন স্টিভকে।

অবশ্য হাচিনসন আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু সাদ্দাম হোসেন কিছুটা জোর করেই ঘড়িটা স্টিভের হাতে পরিয়ে দিয়েছিলেন সেদিন।

জর্জিয়ায় হাচিনসনের বাড়ির একটি সিন্দুকে রাখা সাদ্দামের দেওয়া সেই ঘড়িটা এখনও টিক টিক করে চলেছে। হয়তো একদিন ওই ঘড়িটাও থেমে যাবে। কিন্তু পৃথিবী যেমন চলছিল ঠিক তেমনি চলতে থাকবে।

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
Loading...