সাবধান! বাড়ছে শিশু-কিশোরদের মধ্যে অনলাইন আসক্তি

শিশু কিশোরদের একটি ‘গিনিপিগ প্রজন্ম’ জন্ম নিচ্ছে যারা অতিমাত্রায় ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়ছে

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ সাম্প্রতিক সময় দেশে ঘরে ঘরে অনলাইন ব্যবস্থা চালু হওয়ায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমুল পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সেইসঙ্গে অনলাইনের প্রতি বিশেষ করে শিশুরাও ঝুঁকে পড়ছে। এক কথায় বলা যায় তারা এই অনলাইনে আসক্ত হয়ে পড়ছে।

সাম্প্রতিক সময় বাংলাদেশে প্রযুক্তির অবারিত দ্বার সবার জন্য উন্মোচিত হবার কারণে এটির ব্যবহার বেড়েছে। তবে শিশু কিশোরদের একটি ‘গিনিপিগ প্রজন্ম’ জন্ম নিচ্ছে যারা অতিমাত্রায় ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এর হয়তো একটি ভালো দিক রয়েছে। কিন্তু ভালো যতোটুকু হচ্ছে তার থেকে বেশির ভাগ খারাপের দিকে যাচ্ছে। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো এদের মধ্যে বেশিরভাগই প্রয়োজনীয় তথ্যপুর্ণ ওয়েবসাইট বাদ দিয়ে পর্নোগ্রাফির প্রতিও আসক্ত হয়ে পড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই শিশুদের ওয়েবসাইট ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এটি আমাদের দেশের শিশু-কিশোরদের মধ্যেও সাম্প্রতিক সময় দেখা যাচ্ছে।

আমাদের দেশে মোবাইলে যথেচ্ছা ইন্টারনেট ব্যবহার বেড়েছে। তবে সেটি পয়সা খরচ করে লিমিটেডভাবেই ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু ব্রড ব্যান্ড সংযোগ চালু হওয়ায় এটি আরও অবারিত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে ব্রড ব্যান্ড সংযোগ হওয়ায় আনলিমিটেডভাবে ব্যবহার করা যায় ইন্টারনেট। বাসা-বাড়িতে এই সুযোগ থাকায় শিশু-কিশোরদের মধ্যে এর ব্যবহার আরও বেড়েছে। ওয়াই ফাই এর মাধ্যমে এসব ব্রড ব্যান্ড সংযোগগুলো ব্যবহারের কারণে শুধু পাসওয়ার্ড নিয়ে বাসা-বাড়ির যে কোনো শিশু-কিশোর এটি ব্যবহার করতে পারছে। যে কারণে এর একটা প্রভাব পড়ছে সর্বক্ষেত্রে। যার জন্য স্কুল-কলেজগুলোতে ফলাফলেও এর প্রভাব পড়ছে বলে অনেক অভিভাবকরা মনে করছেন। কারণ অনলাইনে গান থেকে শুরু করে এখন সব কিছুই দেখা যায় অবারিতভাবে।

এ বিষয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে আলাপ করলে তারা বলেছেন এসব আশংকার কথা। একজন অভিভাবক বলেছেন, ইন্টারনেট হয়তো অনেক কিছুকে সহজ করেছে। পড়ালেখা হতে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য সকল ক্ষেত্রেই এটি উপকারে আসলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যাপক খারাপ প্রভাব ফেলছে। সন্তানরা স্কুল থেকে ঘরে ফিরেই আগে মোবাইল নিয়ে বসছে। সব সময় এগুলো নিয়ন্ত্রণ করাও যায় না। আবার ইন্টারনেটে তারা কি গান বা গেম নাকি অন্য কোনো এ্যাডাল কিছু দেখছে সেটিও নিয়ন্ত্রণ করা বা তার পাশে সব সময় বসে থাকা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে একটা খারাপ দিক শিশু-কিশোরদের মধ্যে পড়ছে বলেই তিনি আশংকা প্রকাশ করেছেন। ওই অভিভাবক বলেছেন, এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে, নিজের কাজ কর্ম নষ্ট হলেও বন্ধ করে দেওয়া জরুরি হয়েছে বাসা-বাড়ির ইন্টারনেট! নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য সব কিছুই চলে এখন ইন্টারনেটে। যে কারণে সেটি একেবারে বন্ধ করাও সম্ভব হয়ে ওঠে না।

এমনিভাবে নানা সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে অনেককেই। প্রযুক্তি বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশেও ইন্টারনেটে প্রভূত উন্নতি ঘটেছে। কিন্তু কিছু খারাপ প্রভাব সকলকেই চিন্তিত করে তুলেছে। অবাধ ইউটিউব ব্যবহার, ফেসবুক ও এর ম্যাসেঞ্জার ব্যবহারের মতো বিষয়গুলো অভিভাবকদের ভাবিয়ে তুলেছে।

সম্প্রতি বৃটিশ এমপিদের উদ্যোগে করা এক জরিপে দেখা যায়, ব্রিটেনে ১৬ বছর বয়সী ছেলে-মেয়েদের মধ্যে প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে চার জন এবং ১০ বছর বয়সী প্রতি ৩ জনের মধ্যে ১ জন নিয়মিত পর্নোগ্রাফির ওয়েবসাইট দেখছে। ওই জরিপে দেখা গেছে, ব্রিটেনের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতেও চিকিৎসাধীন কিশোর-তরুণদের এক চতুর্থাংশের বেশির সমস্যা হলো অনলাইন পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি!

ওই গবেষণায় এই ধরনের আসক্তির সঙ্গে আর্থসামাজিক অবস্থার সংযোগও লক্ষ্য করা গেছে বলে ওই রিপোর্টটিতে উল্লেখ করা হয়। দেখা গেছে, ব্রিটেনে ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির প্রতি সবথেকে বেশি আসক্ত হচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা। এক বৃটিশ এমপি বলেছেন, তার স্কুল পড়ুয়া ছেলে তাকে জানিয়েছে যে, তাদের স্কুলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেমোরি স্টিকের মাধ্যমে অশ্লীল ছবি বিনিময় এখন সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে!

এরমধ্যে সবচেয়ে ভীতিকর বিষয় হলো, ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফিতে আসক্তির কারণে কিশোর বয়সী ছেলে-মেয়েদের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক বর্তমানে থাকছে না। সেইসঙ্গে এরা যৌন নীপিড়নকারীদের খপ্পরে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। শিশু-কিশোরদের ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়ার ওপর এই জরিপটি করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন ব্রিটেনের টোরি এমপি ক্লেয়ার পেরি (Claire Perry, MP)।

তাই ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পরিবারে ব্যবহারের জন্য ওয়েবসাইট হতে পূর্ণবয়স্কদের কনটেন্ট বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অনেকেই। অনলাইন চাইল্ড প্রোটেকশনের ওপর এ স্বাধীন (ব্রিটেনের) সংসদীয় ওই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্ঘটনাবশত অনেক ছোট শিশুও অপ্রত্যাশিতভাবেই পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে।

বর্তমানে ব্রিটেনের ১১ হতে ১৬ বছর বয়সী ছেলে-মেয়েদের ৬০ ভাগ নিজের ঘরেই ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ গ্রহণ করছে। যেখানে ৬ বছর পূর্বে মাত্র ৩০ শতাংশ এই সুযোগ পেতো। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের ১২ ভাগ নিজেদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ইন্টারনেটে কিংবা মেমোরি স্টিকে করে আদান-প্রদান করে থাকে। আবার কারও সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ ঘটলেই তখন সেসব ছবি পুরো শ্রেণীকক্ষে ছড়িয়ে পড়ে!

উপরোক্ত ব্রিটেনের অবস্থানের স্থান কাল পাত্র একটু ভিন্ন হলেও, বাংলাদেশেও এর চিত্র প্রায় একই ধরনের। পর্নগ্রাফির সহজলভ্যতার কারণে আশংকাজনকভাবে তা ছড়িয়ে পড়েছে স্কুল পড়ুয়া কিশোর-কিশোরীদের থেকে শুরু করে বখাটেদের হাতে থাকা মোবাইল ফোনে। ফলশ্রুতিতে এর কুফল পড়ছে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার উপর। যৌন নির্যাতন, নিপিড়ন, ধর্ষণ ও খুনের মতো ঘটনাও ঘটছে হর হামেশায়। সুতরাং এখনই বন্ধ করতে হবে এইসব পর্ণগ্রাফির সাইটগুলো। তা না হলে এর ব্যাপক কুফল ভোগ করতে হবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে। তখন শুধরানোর কোনো পথ আমাদের সামনে থাকবে না।

এ বিষয়ে আমাদের অভিভাবকদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে উঠতি বয়সি ছেলে-মেয়েদের প্রতি। তারা কখন কোথায় যায়, কারসঙ্গে মিশছে। মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের উপরেও নজর রাখতে হবে। তা না হলে এর ক্ষতিকর প্রভাবগুলো শুধু ব্রিটেন কেনো আমাদের দেশেও দেখা যাবে।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...