সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বিদায় ঘণ্টা বাজছে?

ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরে সাংবাদিক জামাল খাশোগি খুন হওয়া ও তা ফাঁস হওয়ার পর পশ্চিমা দেশগুলোতে ‘এমবিএস ব্র্যান্ড’ এখন আরও বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বিদায় ঘণ্টা বাজছে? সাংবাদিক জামার খাশোগি খুনের ঘটনায় সারাবিশ্ব যখন চরমভাবে ধিক্কার দিচ্ছে ঠিক তখন তার এই খুনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে যুবরাজের বিদায় আসন্ন।

এই খুনের ঘটনার পর সৌদি জনগণ তাকে বিভিন্ন ভাবে দেখছে। যেমন কেও বলছে, ‘সে শেষ হয়ে হয়ে গেছে’, কেও বলছে, ‘সে খুবই বিপজ্জনক’, আবার কেওবা বলছে ‘আমরা তাকে ভালোবাসি’, ‘তিনি আমার হিরো’ – এমন নানা সমালোচনার মধ্যে পড়ে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে নিয়ে জনমত একেবারেই বিভক্ত।

ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরে সাংবাদিক জামাল খাশোগি খুন হওয়া ও তা ফাঁস হওয়ার পর পশ্চিমা দেশগুলোতে ‘এমবিএস ব্র্যান্ড’ এখন আরও বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। যদিও সৌদি আরব বারবার বলে আসছে, ওই খুনের ঘটনার সঙ্গে প্রিন্স সালমানের কোনো রকম যোগাযোগ ছিল না। তবে এই অস্বীকৃতিকেও দেখা হচ্ছে গভীর সন্দেহের চোখে।

এর একটিই কারণ হলো – যে দেশে ওপরের নির্দেশ ছাড়া প্রায় কোনো কিছুই হয় না, সেখানে কিছু নিয়মভঙ্গকারী অ্যাজেন্ট মিলে জামাল খাশোগিকে খুন করলো, এটা শুনতে প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়।

আরব দেশগুলোতে একটা ‘তত্ত্ব’ চলমান ছিলো যে, খাশোগি সৌদি সরকারের কড়া সমালোচক ছিলেন, তাই এমবিএস চেয়েছিলেন তার ব্যাপারে ‘কিছু একটা করা হোক।’ তবে তিনি কখনও খুনের অনুমতি দেননি। বরং তার অফিস যিনি চালান সেই সাউদ আল-কাহতানি এমবিএসের নির্দেশের বাইরে গিয়েই হত্যাকারীদের বলেছিলেন যে, যুবরাজ সবকিছুর অনুমোদন দিয়েছেন।

তবে বড় সমস্যা হলো সৌদি আরবের বাইরে প্রায় কেওই এ কথা বিশ্বাসই করে না। কারণ এই খুনের ঘটনা নিয়ে প্রথম হতেই সৌদি আরবের দিক থেকে একেকবার একেক রকম কথা বলা হয়েছে। তাই এটাই অনুমান করে নেওয়া যায় যে- প্রিন্স সালমান তার মোটা অংকের বেতন পাওয়া মিডিয়া উপদেষ্টাদের কথা কানে শুনলেও পাত্তাই দেননি।

যে কারণে এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে, এমবিএস এখন বিশ্বজনমতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন। পশ্চিমা দেশগুলোর সরকার এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যে তার সঙ্গে কোনো সংস্রব রয়েছে এটা তারা দেখাতে চাইছে না।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু পশ্চিমা সংস্থা ও মার্কিন কংগ্রেসম্যান এখন দাবি করছেন যে, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে এবার অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হোক। বর্তমানে সৌদি আরব দাঁড়িয়ে রয়েছে এক মোড় বদলকারী মুহূর্তে। এখন কি করতে পারে দেশটি? সে প্রশ্ন সবার মনে।

তাহলে কি সৌদি রাজপরিবারের সিনিয়র প্রিন্সরা মিলে এমবিএসের ক্ষমতা কিছুটা কমিয়ে দেবেন? যাতে করে এই বিক্ষুব্ধরা খুশি হয়? নাকি তাকে যুবরাজের পদ হতে পুরোপুরি সরিয়ে দিয়ে একটা নামমাত্র ও অর্থহীন পদোন্নতি দেওয়া হবে?

নাকি এই ঝড় কেটে যাওয়ার জন্য তারা অপেক্ষা করবেন? বিবিসির ফ্রাংক গার্ডনার ওই প্রতিবেদনে আরও লিখেছেন, সৌদি রাজপরিবারের অন্দরমহলে, বন্ধ দরজার ওপাশে বর্তমানে এই প্রশ্নগুলো নিয়েই ‘অত্যন্ত গুরুতর’ আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

ব্যাপারটা কতো গুরুতর তার একটা আভাস পাওয়া যায় একটি ঘটনা হতে। ৮২ বছর বয়স্ক সৌদি বাদশাহ সালমানের একমাত্র জীবিত ভাই প্রিন্স আহমেদ বিন আবদেল আজিজ হঠাৎ করেই গত মঙ্গলবার রিয়াদে ফিরে আসেন। তিনি এতোদিন লন্ডনে ছিলেন, কারণ তিনিই ছিলেন এমবিএসের বিরোধীদের মধ্যে ‘গুরুস্থানীয়’ একজন ব্যক্তি যিনি ইয়েমেনে যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, এর জন্য সম্পূর্ণ দায়ী করেছিলেন যুবরাজ সালমান ও তার পিতাকে। তার ভয় ছিল যে- দেশে ফিরলেই হয়তো তাকে গৃহবন্দী করা হবে।

কিন্তু তার ফিরে আসায় কোনো গোপনীয়তা ছিলো না। বরং গভীর রাতে রিয়াদে নামার পর প্রিন্স আহমেদ বিন আবদেল আজিজকে আগরবাতির ধোঁয়া ও অন্য প্রিন্সদের উষ্ণ আলিঙ্গন দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়! অভ্যর্থনাকারীদের মধ্যে নাকি এমবিএসও ছিলেন! প্রিন্স আহমেদ বর্তমানে চেষ্টা করছেন পুরো রাজপরিবারকে একসঙ্গে করতে। তবে এমবিএসের ভবিষ্যৎ নিয়ে কি ধরণের আলোচনা করছেন তারা তা এখনও নিশ্চিত নয়।

কথা হলো ৩৩ বছর বয়স্ক প্রিন্স সালমানকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কেও এখনও নেই। যুবরাজ পূর্বেই সব চ্যালেঞ্জারদের সরিয়ে দিয়েছেন। যুবরাজ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করেন, রাজপরিবারের রক্ষক বাহিনী অর্থাৎ ন্যাশনাল গার্ড নিয়ন্ত্রণ করেন। আবার প্রতিরক্ষামন্ত্রীও তিনিই; তাই সৌদি সশস্ত্র বাহিনীও তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

আবার রাজকীয় আদালত, অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়ন ও দেশ পরিচালনার প্রকৃত কর্তৃত্ব; এসবগুলোও এমবিএসের হাতে, যদিও বাদশাহ তার অসুস্থ পিতা।

বেশ কিছুদিন যাবত এটা স্পষ্ট হচ্ছিল যে, এমবিএস কোনো গণতান্ত্রিক নেতাই নন। তাকে জানেন এমন একজন বর্ণনা করেছেন যে, এই লোকটি আসলে ‘একজন বেপরোয়া, নিয়ন্ত্রণহীন গুন্ডা!’

তবে তার অনেক বাড়াবাড়িই সৌদি আরবের মানুষ এতোদিন ধরেই মেনে নিচ্ছিল। লক্ষ লক্ষ তরুণ সৌদির কাছে প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান তাদের কাছে ভবিষ্যতের আশার প্রতীক। একজন সাহসী, আকর্ষণীয় নেতা, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সংস্কারক- যিনি প্রকৃতপক্ষে ধর্মীয় নেতাদের ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছেন, মেয়েদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দিয়েছেন, সৌদি সমাজে বিনোদনের সুযোগ করে দিয়েছেন। তেলভিত্তিক সৌদি অর্থনীতিরও সংস্কার করেছেন।

ওয়াশিংটন, লন্ডন কিংবা প্যারিসের কূটনীতিক বা নীতিনির্ধারকদের কাছে মনে হতেই পারে, প্রিন্স সালমানকে সরিয়ে দেওয়া বা তাকে সংযত করাই বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক বিকল্প। তবে সৌদি আরবের রক্ষণশীল রাজপরিবার এই ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী। তারা এরকম কিছু না করতে চাইবে।

সে কারণে এ পর্যায়ে এটা বলা খুবই কঠিন যে এমবিএসের দিন শেষ হয়ে গেছে। ২০১১ সালের মাঝামাঝি আরব বসন্তের সময় প্রায় সবাই ভেবেছিলেন যে, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ কয়েক মাসের মধ্যেই ক্ষমতাচ্যুত হয়ে যাবেন। কিন্তু তারপর ৭ বছর পেরিয়ে গেছে। বাশার আল আসাদ আজও ক্ষমতায় রয়েছেন। তাই সময়ই বলে দেবে আসলে কি ঘটতে চলেছে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভাগ্যে।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...