এম. এইচ. সোহেল ॥ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক অনন্য এবং প্রভাবশালী নেতৃত্বের প্রতীক। তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং তিনবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁর নেতৃত্ব, আন্দোলন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন তাকে “আপোষহীন নেত্রী” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই আপোষহীনতা কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়; বরং এটি তাঁর আদর্শিক বিশ্বাস, ক্ষমতার প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান এবং গণতান্ত্রিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ঘটে এক কঠিন ঐতিহাসিক বাস্তবতায়। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপি চরম সংকটে পড়ে। সেই সময় রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। গবেষকরা মনে করেন, এই পর্যায়ে তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল চাপের মুখে নতি স্বীকার না করা। সামরিক শাসনের ছায়ায় রাজনীতি করা সহজ পথ ছিল না, তবুও তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে কোনো আপোষে যাননি।
১৯৮০-এর দশকে স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তার ভূমিকা আপোষহীন নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বারবার গ্রেফতার, গৃহবন্দি ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েও তিনি আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াননি। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ক্ষমতায় অংশীদারিত্বের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি স্বৈরশাসনের সঙ্গে সমঝোতার পথ বেছে নেননি-যা তাকে সাধারণ রাজনীতিকদের থেকে পৃথক করেছে।

১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক ধারায় ক্ষমতায় এসে তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। এটি তাঁর রাজনৈতিক আপোষহীনতার ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বহুদলীয় রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন। যদিও তাঁর শাসনামল নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে, তবুও মৌলিক রাজনৈতিক আদর্শের প্রশ্নে তিনি দৃঢ় অবস্থানে ছিলেন।
১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে রাজনৈতিক সংকটের মুখে তিনি ক্ষমতা ছাড়েন। গবেষণামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবেই বিবেচিত হয়। অনেকের মতে, ক্ষমতায় থাকার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আপোষ না করে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন- যা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বিরল দৃষ্টান্ত।
কারণ ওই সময় দেশের অন্যান্য দলগুলোর তত্তাবধায়ক পদ্ধতির দাবির মুখে এককভাবেই নির্বাচন করে সংসদে গিয়ে তত্তাবধায়ক পদ্ধতি পাস করে সংসদ ভেঙে দেন। যা নজিরবিহীন বলা যায়। তিনি ইচ্ছে করলে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। নীতিগতভাবে তাই তিনি সব সময় স্বচ্ছ থেকেছেন।
২০০৬ সালের পর রাজনৈতিক সংকট, ওয়ান-ইলেভেন ও পরবর্তী সরকারগুলোর সঙ্গে সংঘাতে তার আপোষহীনতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর তিনি নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রশ্নে কোনো সমঝোতায় যাননি। এই অবস্থানের ফলে তাকে রাজনৈতিক মামলা, কারাবাস ও দীর্ঘ সময় রাজনীতির বাইরে থাকতে হয়েছে। তবুও তিনি অবস্থান পরিবর্তন করেননি, যা তার দৃঢ়তার প্রমাণ।

তার দীর্ঘ কারাবাস এবং শারীরিক অসুস্থতার সময়েও সমর্থকদের কাছে তিনি প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, তিনি একটি “symbolic opposition leadership”-এ পরিণত হন, যেখানে ব্যক্তিগত কষ্ট রাজনৈতিক আদর্শকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
সমালোচকদের মতে, তার এই আপোষহীনতা কখনও কখনও রাজনৈতিক অচলাবস্থাকে দীর্ঘ করেছে। তবে গবেষক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশই মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আপোষহীন অবস্থানই তাঁকে একটি ঐতিহাসিক চরিত্রে রূপ দিয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়ার আপোষহীনতা কেবল রাজনৈতিক বিরোধিতাই নয়; এটি ক্ষমতার বাইরে থেকেও আদর্শ ধরে রাখার এক দীর্ঘ সংগ্রামের নাম। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং আপোষহীন নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবেই তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থায়ীভাবে স্থান করে নিয়েছেন। এই জাতি তাঁকে চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।
>>>>>>>>>>>>>>
ডেঙ্গু প্রতিরোধ করবেন যেভাবে
মশা বাহিত একপ্রকার ভাইরাস জ্বর হলো ডেঙ্গু। এই জ্বর অন্যান্য ভাইরাস কিংবা ব্যাকটেরিয়াজনিত জ্বর থেকে ভিন্ন। অবশ্য এই জ্বর কোনোভাবেই ছোঁয়াচে নয়। এই ভাইরাস জ্বর এককভাবে বা অন্যান্য ভাইরাস (চিকুনগুনিয়া, ইয়েলো ফিভার, বার্মা ফরেস্ট, ফ্লু, রেসপাইরেটরি সিনসাইটিয়াল) এবং ব্যাকটেরিয়া (নিউমোক্কাস)-এর সঙ্গেও হতে পারে।
লক্ষণ ও জ্বরের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে ডেঙ্গুজ্বরকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে-
১. সাধারণ ডেঙ্গুজ্বর
২. রক্তপাতসহ ডেঙ্গুজ্বর।
সাধারণ ডেঙ্গুজ্বরের ক্ষেত্রে চোখে পড়ে মূলত নিচের এই লক্ষণগুলো-
১. হঠাৎ করে তীব্র জ্বর ও তা ২ থেকে ৭ দিন স্থায়ী হওয়া।
২. তীব্র মাথাব্যথা হওয়া।
৩. চোখের পেছনের অংশে ব্যথা হওয়া।
৪. জ্বরের সঙ্গে সঙ্গে সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি চোখে পড়া।
৫. সম্পূর্ণ শরীরে তীব্র ব্যথা ও সেইসঙ্গে কোমরে ব্যথা।
৬. বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
৭. ত্বকে র্যাশ বা লাল দানা দানা দেখা দেওয়া।
রক্তপাতসহ ডেঙ্গুজ্বরের ক্ষেত্রে :
১. ২ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তীব্র জ্বর সঙ্গে নাক, মুখ বা বমির সঙ্গে রক্ত যাওয়া।
২. জ্বরের পাশাপাশি বুকে বা পেটে পানি জমে যাওয়া।
এইসব লক্ষণের যে কোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
অপরদিকে
জ্বরের প্রথম ৩ দিন বাড়িতে অপেক্ষা করুন। অপরদিকে সারা শরীর পানি দিয়ে স্পঞ্জ করুন কিছুক্ষণ পরপর। এতে করে জ্বরের মাত্রা কমে আসবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান ও বিশ্রাম নিতে হবে। এরপরেও জ্বর না কমলে বা কিছু সময় পরপর বাড়তে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় বিষয়:
১. বাড়ির আশপাশ যতোটা সম্ভব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে চেষ্টা করুন।
২. ঘরের ভেতরে থাকা ফুলের টব বা ভাঙা প্লাস্টিকের বোতল, ডাবের খোসা, টায়ার অথবা পলিথিন থাকলে তা দ্রুত পরিষ্কার করে ফেলুন ও ফুলের টব থেকে জমে থাকা পানি নিষ্কাশন করুন।
৩. মশা নিধনের জন্য সপ্তাহে অন্তত ৩ বার স্প্রে বা ফগিং করুন।
৪. বাড়ির বাইরে যাওয়ার সময় মশা নিধনে ব্যবহৃত ক্রিম সঙ্গে রাখতে পারেন।
৫. সন্ধ্যার পর বাড়ির ছোট থেকে বড় সদস্যরা মশারি ব্যবহার করুন।
৬. যেখানে-সেখানে জমে থাকা বৃষ্টির পানি পরিষ্কার করে ফেলুন, কারণ এতে এডিস মশা ডিম পেড়ে থাকে এই সময়।
৭. অপরদিকে মশার প্রকোপ থেকে বাঁচতে মশারির সঙ্গে সঙ্গে ম্যাট ব্যবহার করতে পারেন।
৮. এডিস মশা যেহেতু দিনের বেলা কামড়ায় তাই দিনের বেলায় ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি টানিয়ে ঘুমানোর দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সূত্র: https://dmpnews.org