ব্রেকিং নিউজ: কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ এইমাত্র পাওয়া সংবাদে জানা গেছে যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। রাত ১০.৩০ মিনিটে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি সূত্রে এ খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।

Kamaruzzaman

এইমাত্র পাওয়া সংবাদে জানা গেছে যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। রাত ১০.৩০ মিনিটে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি সূত্রে এ খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। তার লাশ পরিবারের সদস্যদের হাতে হস্তান্তর করা হবে। কেন্দ্রীয় কারাগার হতে কামারুজ্জামানের মৃতুদেহ নিয়ে যাওয়া হবে শেরপুরে নিজ গ্রামে। বড় ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ওনার (কামারুজ্জামানের) শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী শেরপুরে ওনার প্রতিষ্ঠিত কুমরী বাজিতখিলা এতিমখানার পাশেই তাঁকে কবর দেওয়া হবে।’

কি কি অভিযোগ ছিল কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে:

জামায়াতে ইসলামের সহকারী সেক্রেটারী জেরারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের ৭টি ঘটনায় ২০১২ সালের ৪ জুন অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়েছিল।

প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগে বলা হয়: ‘১৯৭১ এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কামারুজ্জামান জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ছাত্রসংঘের ময়মনসিংহ জেলার সভাপতি ছিলেন।

’৭১’র ২২ এপ্রিল তিনি জামালপুরের আশেক-মাহমুদ কলেজের ইসলামী ছাত্রসংঘের বাছাই করা নেতাকর্মীদের নিয়ে আলবদর বাহিনী গড়ে তোলেন। এই বাহিনী বৃহত্তর ময়মনসিংহে (ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও টাঙ্গাইল) গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং দেশত্যাগে বাধ্য করাসহ মানবতাবিরোধী বিভিন্ন অপরাধ সংগঠিত করে।

তার বিরুদ্ধে আনা সুনির্দিষ্ট ৭টি অভিযোগ:

১ম অভিযোগ

বদিউজ্জামানকে হত্যা : এতে বলা হয়, ৭১’র ২৯ জুন সকালে কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে আলবদররা শেরপুরের ঝিনাইগাতী থানার রামনগর গ্রামের আহম্মেদ মেম্বারের বাড়ি হতে শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী থানার কালীনগর গ্রামে ফজলুল হকের ছেলে বদিউজ্জামানকে অপহরণ করে নিয়ে যায় আহম্মেদনগরে পাকিস্তানী সেনাদের ক্যাম্পে। সেখানে তাকে সারারাত নির্যাতন করা হয়। পরদিন আহম্মদনগরের রাস্তার ওপরে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। পরে লাশ টেনে নিয়ে কাছাকাছি কাঠের পুলের নিচে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।

২য় অভিযোগ

অধ্যক্ষ আব্দুল হান্নানকে নির্যাতন: কামারুজ্জামান এবং তার সহযোগীরা শেরপুর কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ আবদুল হান্নানকে একাত্তরের মে মাসের মাঝামাঝির এক দুপুরে মাথা ন্যাড়া করে উলঙ্গ অবস্থায় গায়ে এবং মুখে চুনকালি মাখিয়ে গলায় জুতার মালা পরিয়ে চাবুক দিয়ে পেটাতে পেটাতে শেরপুর শহর ঘোরায়।

৩য় অভিযোগ

সোহাগপুরে গণহত্যা: ৭১’র ২৫ জুলাই ভোর বেলায় কামারুজ্জামানের পরিকল্পনা এবং পরামর্শে রাজাকার, আলবদরসহ পাকিস্তানী সেনাবাহিনী শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ির সোহাগপুর গ্রাম ঘিরে ফেলে। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১২০ জন পুরুষকে ধরে নিয়ে হত্যা করে। এ সময় ধর্ষণের শিকার হয় গ্রামের মহিলারা। ওই ঘটনার দিন হতে সোহাগপুর গ্রাম ‘বিধবাপল্লী’ নামে পরিচিত।

৪র্থ অভিযোগ

গোলাম মোস্তফাকে হত্যা: ৭১’র ২৩ আগস্ট মাগরিবের নামাজের সময় গোলাম মোস্তফা তালুকদার নামে এক ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। কামারুজ্জামানের নির্দেশে তাকে সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাড়িতে অবস্থিত আলবদর ক্যাম্পে রাখা হয়। মোস্তফার চাচা তোফায়েল ইসলাম এরপর কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করে তার ভাতিজাকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু ওই রাতে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা গোলাম মোস্তফা এবং আবুল কাশেম নামের আরেক ব্যক্তিকে মৃগি নদীর ওপর শেরি ব্রিজে নিয়ে গিয়ে গুলি করে। গুলিতে গোলাম মোস্তফা নিহত হলেও হাতের আঙ্গুলে গুলি লাগায় নদীতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণে বেঁচে যান আবুল কাশেম।

৫ম অভিযোগ

লিয়াকতসহ ৮ জনকে হত্যা: মুক্তিযুদ্ধকালে রমজান মাসের মাঝামাঝি এক সন্ধ্যায় কামারুজ্জামান এবং তার সহযোগীরা শেরপুরের চকবাজার হতে লিয়াকত আলী ও মুজিবুর রহমানকে অপহরণ করে বাঁথিয়া ভবনের রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখানে তাদের নির্যাতনের পর থানায় ৪ দিন আটকে রাখা হয়। পরে কামারুজ্জামানের নির্দেশে, ওই দু’জনসহ ১৩ জনকে ঝিনাইগাতীর আহম্মেদনগর সেনা ক্যাম্পে পাঠানো হয়। লিয়াকত, মুজিবুরসহ ৮ জনকে উপজেলা পরিষদের কার্যালয়ের কাছে সারিবদ্ধ করে দাঁড় করিয়ে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ কামারুজ্জামান এবং তার সহযোগী কামরান সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

৬ষ্ঠ অভিযোগ

টুনু হত্যা: ৭১’র নভেম্বরে কামারুজ্জামানের নির্দেশে আল-বদর সদস্যরা টুনু এবং জাহাঙ্গীর নামে দুজনকে ময়মনসিংহের জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে আলবদর ক্যাম্পে নিয়ে যান। টুনুকে সেখানে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। জাহাঙ্গীরকে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।

৭ম ও শেষ অভিযোগ

৬ জনকে হত্যা: মুক্তিযুদ্ধকালে ২৭ রমজান দিন দুপুরে কামারুজ্জামান আল-বদর সদস্যদের নিয়ে ময়মনসিংহের গোলাপজান রোডের টেপা মিয়া এবং তার বড় ছেলে জহুরুল ইসলাম দারাকে ধরে জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় আলবদর ক্যাম্পে নিয়ে যায়। এর পরদিন সকালে আলবদররা ওই দু’জনসহ আরও ৭জনকে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে নিয়ে হাত বেঁধে সারিবদ্ধ করে দাঁড় করান। প্রথমে টেপা মিয়াকে বেয়নেট দিয়ে খোঁচাতে গেলে তিনি নদীতে লাফ দেন। আল-বদররা গুলি করলে তার পায়ে গুলি লাগে। তবে তিনি পালাতে সক্ষম হন। কিন্তু অন্য ৬ জনকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

বিচারের বিবরণ

আনুষ্ঠানিক অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী কামারুজ্জামান এসব অপরাধ করেছেন একাত্তরের ২৫ মার্চ হতে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে। এর মধ্যে ৩ ও ৪ নম্বর অভিযোগে সোহাগপুরের গণহত্যা ও গোলাম মোস্তফা তালুকদার নামের এক ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদন্ড আদেশ দিয়ে ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেছিলেন, ‘সে যেভাবে এসব অপরাধ ঘটিয়েছে, তাতে সর্বোচ্চ শাস্তি না দিলে সুবিচার হবে না।’ ১ ও ৭ নম্বর অভিযোগে বদিউজ্জামানকে হত্যা ও টেপা মিয়ার ছেলেসহ ৫ জনকে হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হওয়ায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আর ২ নম্বর অভিযোগে শেরপুর কলেজের তৎকালীন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হান্নানকে নির্যাতনের ঘটনায় তাকে দেওয়া হয়েছে ১০ বছরের কারাদণ্ড। এছাড়া ২টি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় (অভিযোগ ৫ ও ৬) তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

কামারুজ্জামানকে ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদন্ডের রায় বহাল রেখে গত বছর (২০১৪) ৩ নভেম্বর রায় দেয় সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ। আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার নেতৃত্বে ৪ সদস্যের বেঞ্চে এই রায় ঘোষণা করা হয়। বেঞ্চের অপর ৩জন বিচারপতি হলেন বিচারপতি মো.আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী এবং বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

কামারুজ্জামানের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ (পুর্নবিবেচনা) আবেদনও খারিজ করে দেয় সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ৪ সদস্যের বেঞ্চ এই রায় দেয়। এরপর কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রস্তুতি শুরু হয়। আজ ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে বিচারিক কাজের পরিসমাপ্তি ঘটলো।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...