দশ বছরে মারা গেছে ৬ হাজারের বেশি মানুষ ॥ দুই শতাধিক যাত্রী নিয়ে লঞ্চডুবি ॥ ৪০ লাশ উদ্ধার

মুন্সীগঞ্জ (গজারিয়া) প্রতিনিধি ॥ আবারও লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটেছে। মুন্সীগঞ্জের মেঘনা নদীতে দুই শতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যাওয়া শরীয়তপুর-১ নামের লঞ্চ থেকে নারী-শিশুসহ সর্বশেষ খবর পাওয়া খবরে জানা গেছে, ৪০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ১২ মার্চ রাত সাড়ে ৯টার দিকে লঞ্চটি শরীয়তপুরের সুরেশ্বর থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে। রাত ২টার দিকে লঞ্চটি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে একটি মালবাহী কার্গো জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ডুবে যায়। এ সময় ঢাকাগামী মিতালী নামের একটি লঞ্চ দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চ থেকে প্রায় ৩৫-৪০ জনকে উদ্ধার করে। এ সময় বেশ কয়েকজন সাঁতরে প্রাণ বাঁচালেও বাকিরা লঞ্চে আটকা পড়েছেন বলে আশংকা করা হচ্ছে।

ঘটনার পর উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম ঘটনাস্থলে পৌঁছে। বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান শামসুজ্জোহা খন্দকার জানান, লঞ্চটি প্রায় ৭০ ফুট পানির নিচে রয়েছে। ১৩ মার্চ দুপুর ১২টার দিকে গজারিয়া উপজেলার লঞ্চঘাটের কাছাকাছি চরযাত্রা এলাকায় লঞ্চটির অবস্থান শনাক্ত করা হয়। নারায়ণগঞ্জ থেকে উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম সকাল ৮টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও বিআইডব্লিউটিএ’র সহযোগিতায় উদ্ধার কাজ চালায়। এদিকে স্বজনদের আহাজারিতে মেঘনার বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। পরিচয় পাওয়ার পর ২৭ জনের লাশ তাদের আত্মীয়-স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তারা হল- রূপবান বিবি, হানিফ বাবুল, সিফাত ঢালী, ইসমাইল মাঝি, বাপ্পি, হাবিবুল, আমিন, প্রীতি আহমেদ, সালাউদ্দিন, সাবেদ আলী, আঃ লতিফ বিপ্লব, রশিদন নেছা, শবনম, বাদশা মাঝি, সিরাজ দেওয়ান, আলমগীর মালধ, রফিকুল ইসলাম, পারভেজ, রুবেল, আকরাম, দিয়ানা, মিনাজুল, রিপন, শাহরিয়ার, শাহজামাল, রেজা ফারুক ও রিপন আখন। এ প্রাণহানির ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তারা নিহতদের রুহের মাগফেরাত কামনা ও তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

ঘটনাস্থলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব
ঘটনাস্থলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল মান্নান হাওলাদার উদ্ধার কাজ সম্পর্কে জানান, যতক্ষণ পর্যন্ত লাশ পাওয়া যাবে, ততক্ষণ উদ্ধার কাজ চালানো হবে। নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেকের পরিবারকে ৩০ হাজার টাকা এবং একই পরিবারের একাধিক সদস্য হলে ৪৫ হাজার টাকা দেয়া হবে। এছাড়া দাফন-কাফনের জন্য অতিরিক্ত তিন হাজার টাকা করে দেয়ার কথা জানান তিনি। এদিকে এ ঘটনায় নৌ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে পাঁচদিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছাড়াও শরীয়তপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য নাঈম রাজ্জাক, মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম ইদ্রিস আলী, শরীয়তপুর-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা শুফকুর রহমান কিরন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং স্বজনদের সমবেদনা জানান।

লঞ্চের বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা যা বলেন..
লঞ্চের বেঁচে যাওয়া যাত্রী দুলাল দেওয়ান জানান, ভাই আমেরিকা যাবে তাই তাকে বিদায় জানাতে পরিবারের ৮ জনকে নিয়ে লঞ্চে ঢাকা যাচ্ছিলাম। লঞ্চ ডুবে যাওয়ার পর আমি বের হতে পারলেও বাকিরা কেবিনে থাকায় বের হতে পারেনি। নাসির জানান, তার ভাগিনা শামিম, বোন পলি, খাদিজা, রিপাকে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি আরও জানান, লঞ্চটিতে অতিরিক্ত যাত্রী ছাড়াও তিনশ’ বস্তা মরিচ ছিল। যাত্রী আবদুল গনি আকন্দ বলেন, ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম। জেগে দেখি পানিতে তলিয়ে যাচ্ছি। আমি ভেসে ওঠলেও বন্ধু আবুল হোসেনকে এখনও পাইনি।
ফায়ার সার্ভিসের ডুবরি আবুল খায়ের জানান, হাতের কাছে যে লাশ পাওয়া গেছে তা বের করে আনা হচ্ছে। বাকি লাশগুলো কেবিনের ভেতরে এবং দড়ি দিয়ে আটকানো থাকায় বের করে আনা সম্ভব হচ্ছে না।

অক্টোবরে লঞ্চের মেয়াদ শেষ
১৯৯১ সালে নির্মিত লঞ্চ এমভি শরীয়তপুর-১ সোমবার মধ্যরাতে ডুবে যায়। এ বছরের ৭ অক্টোবর এর মেয়াদ শেষ হতো। লঞ্চটির দৈর্ঘ ৩২ মিটার, প্রস্থ্য ৮.০৫ মিটার। এর ধারণ ক্ষমতা দিনে ৩৩২ জন, রাতে ২২৫ জন।

তদন্ত কমিটি গঠন
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে আড়াইশ’ যাত্রী নিয়ে লঞ্চডুবির ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব বায়তুল আমিন ভূঁইয়াকে প্রধান করে গঠিত এ কমিটিকে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। এদিকে দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান। মঙ্গলবার দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ৩০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণা দেন তিনি। দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি মারা গেলে ওই পরিবারকে দেয়া হবে ৪৫ হাজার টাকা।
তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বিআইডব্লিউটিএ’র একজন পরিচালক, মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক), সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের প্রধান পরিদর্শক ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোতাহার হোসেন।

১০ বছরে মারা গেছে ৬ হাজারের বেশি মানুষ
১০ বছরে নৌদুর্ঘটনায় মারা গেছে ৬ হাজারের বেশি মানুষ। এসব দুর্ঘটনা রোধে ৩০ বছরে ৬ শতাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও আলোর মুখ দেখিনি একটিও। দেশে প্রতি বছরই নৌদুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। এতে বিপুলসংখ্যক প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নেয়া হচ্ছে না তেমন কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।

সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের এক জরিপে দেখা গেছে, নৌদুর্ঘটনায় নিহতের পাশাপাশি পঙ্গুত্বের অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছে আরও ৬০ হাজার মানুষ। বর্ষা মৌসুমে অরক্ষিত ও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে দেশের প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার নৌপথ। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করে নৌপথে। অথচ নৌপথে দুর্ঘটনা রোধে আগাম কোন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে না কর্তৃপক্ষ। জানা গেছে, বর্তমানে সারাদেশে ২০ হাজার নৌযান চলাচল করলেও ১২ হাজার লঞ্চেরই কোন ফিটনেস নেই। ফলে নৌদুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। গত বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে মেঘনা নদীতে এমভি বিপাশা নামের একটি যাত্রীবাহী লঞ্চ ডুবে গেলে কমপক্ষে ৩৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। নিখোঁজ হয় আরও শতাধিক। এপ্রিল থেকে নভেম্বর- এই ৮ মাসকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে নৌবন্দর কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করলেও লঞ্চ মালিক, পরিবহন শ্রমিক এবং যাত্রীদের মধ্যে কোন ধরনের সচেতনতা বোধের সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

১৩ মার্চ এমভি শরীয়তপুর-১ লঞ্চ দুর্ঘটনার পর তিনটি সংস্থার তিনজন কর্মকর্তাকে দিয়ে পৃথক তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তিনটি কমিটি কাজও শুরু করেছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আদৌ আলোর মুখ দেখবে কিনা তাতে সন্দেহ রয়েছে। আর রিপোর্ট বের হলেও রিপোর্টের সুপারিশ বাস্তবায়ন হবে কিনা তাতেও সন্দেহ রয়েছে।
১৯৭১ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত গত ৪০ বছরে দেশে ১০৮০টি নৌদুর্ঘটনা ঘটেছে। শুধু ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দশ বছরে মারা গেছে প্রায় ৬ হাজার মানুষ। আর ৪০ বছরে এই মৃত্যুর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে আড়াই লাখ মানুষ। স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করেছে ৬০ হাজার লোক। এরপরও কমছে না নৌদুর্ঘটনা। ২০০৫ সালে এমভি মহারাজ নামে একটি লঞ্চডুবির ঘটনায় ১৫১ জন যাত্রীর সলিল সমাধি ঘটে। এই দুর্ঘটনার পর একাধিক তদন্ত কমিটি হয়। কিন্তু কোন কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। ২০০৭ সালে কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ঘোড়াদিয়া নদীতে এমভি চানপুর ডুবে অর্ধশতাধিক মানুষ মারা যায়।

আর কতদিন মানুষ অকালে প্রাণ হারাবে?
বার বার লঞ্চ ডুবির ঘটনা ঘটছে, তদন্ত কমিটি গঠিত হচ্ছে কিন্তু কমিটির সুপারিশসমূহ কখনো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যে কারণে একই ঘটনার বার বার পূনরাবৃত্তি ঘটছে। কখনওবা ফিটনেস ছাড়ায় চলছে লঞ্চ। আবার কখনও অতিরিক্ত যাত্রী বহনের জন্য ঘটছে দুর্ঘটনা। এভাবে আর কতদিন মানুষ অকালে প্রাণ হারাবে? সে প্রশ্ন এখন ভুক্তভোগিদের।

Advertisements
Loading...