The Dhaka Times
তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে রাখার প্রত্যয়ে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ম্যাগাজিন।

হারিয়ে যাওয়া মায়ান শহর: চিচেন ইতজা

চিচেন ইতজা নামটির উৎপত্তি ঘটেছে মায়ান ভাষার পরিভাষা থেকে যার অর্থ “ ইতজাদের কুয়া মুখে”

দি ঢাকা টাইমস্ ডেস্ক ॥ মেক্সিকোর ইয়ুকাতান পেনিনসুলাতে অবস্থিত মায়ান শহর চিচেন ইতজা। মেক্সিকোর গুরুত্বপূর্ণ টুরিস্ট অ্যাট্রাকশন হলেও সক্রিয় প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবেও এর গুরুত্ব কম নয়। চিচেন ইতজা থেকে এখনও মায়ান সংস্কৃতি এবং সভ্যতা সম্পর্কে বিভিন্ন অজানা তথ্যের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। মায়া সভ্যতা নিয়ে আগের লেখায় চিচেন ইতজার উল্লেখ থাকলেও এবার বিস্তারিত ভাবে জানবো চিচেন ইতজা সম্পর্কে।

কোথায় অবস্থিত চিচেন ইতজা?

মেক্সিকোর ইউকাতান পেনিনসুলার রিসোর্ট শহর ক্যানকুন থেকে ১২০ মাইল দূরে অবস্থিত ছিল চিচেন ইতজা। চিচেন ইতজা নামটির উৎপত্তি ঘটেছে মায়ান ভাষার পরিভাষা থেকে যার অর্থ “ ইতজাদের কুয়া মুখে”। ইতজারা ছিল মায়ানদের এক আদিবাসী গোষ্ঠী যারা ছিল ইউকাতান পেনিনসুলার উত্তর অংশে, যেখানে শহরটি অবস্থিত ছিল, সেখানের শক্তিশালী এক জনগোষ্ঠী।

চিচেন ইতজাঃ

Map of Chichen Itza

শহরটির নামের মধ্যে যে কুয়ার কথা উল্লেখ আছে তা নির্দেশ করে ভূগর্ভস্থ কিছু নদীকে যেগুলো পুরো এলাকা জুড়ে প্রবাহিত হত এবং এই নদীগুলোই ছিল শহরের মূল পানির উৎস। এই পানির উৎসই চিচেন ইতজা শহরের অবস্থানকে যথাযথ করে তুলেছিল।

চিচেন ইতজার ইতিহাস:

চিচেন ইতজার প্রাচীন ইতিহাস এখনও স্পষ্ট না, তবে, এই বিষয়টি স্পষ্ট যে, ক্লাসিক পিরিয়ডের সময় ( ২৫০ খ্রিস্টাব্দ- ৯০০ খ্রিস্টাব্দ) এই শহর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিওতিহুয়াকানের পতনের পর সেখানকার জনগণ মেসোআমেরিকাতে এসে বসতি স্থাপন করে বলে ধারণা করা হয়, এবং তখনই তারা মায়ান গোষ্ঠী ইতজাদের সংস্পর্শে আসে। দ্বিতীয় পর্যায়ে এই শহর গঠিত হয় যখন টোলটেক সভ্যতা দ্বারা ইতজা গোষ্ঠী প্রভাবিত হয়। চিচেন ইতজা ইসলা ক্যারিটোস বন্দর যুক্ত একটি সমৃদ্ধশালী বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল এবং এর প্রমাণ মেলে মধ্য আমেরিকায় অন্যান্য এলাকার পণ্যের সন্ধান পাওয়ার মাধ্যমে- উত্তরের টারকুইস, দক্ষিণ থেকে সোনার ডিস্ক এবং তেহুয়ান্তেপেক এর ইস্থমাস থেকে কাঁচের গোলক সদৃশ আগ্নেয়শিলা। চিচেন ইতজাতে কোকো চাষ হত এবং সম্ভবত উত্তর দিকের উপকূলবর্তী এলাকার লবণ তৈরির কেন্দ্রগুলোও এখান থেকে পরিচালিত হত।

কখন গড়ে উঠেছিল চিচেন ইতজা?

চিচেন ইতজার ইতিহাস নিয়ে যারা গবেষণা করছে, তাদের মধ্যে চিচেন ইতজা কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং কিভাবে ধাপে ধাপে এই শহরের উন্নয়ন ঘটেছিল তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কারো মতে, চিচেন ইতজা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে। কিছু গবেষণা বলে, চিচেন ইতজার প্রতিষ্ঠাকাল ৪০০ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে আর কিছু গবেষণা বলে এই শহরের সূচনা ঘটেছিল ৫ম শতাব্দীর মাঝখানে। আর যে বিষয়টি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে খুব কম বিতর্ক হয় সেটা হল মায়ান সভ্যতার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য চিচেন ইতজার গুরুত্ব। এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে চিচেন ইতজা উন্নীত হয় ৬০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এবং সেই সময়ের মধ্যেই চিচেন ইতজা হয়ে ওঠে মায়ান বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর শহর। এই শহরের বিস্তার ছিল প্রায় দুই বর্গমাইল পর্যন্ত। শহরটি ব্যবসায়িক কেন্দ্র ও বাড়িঘরে পরিপূর্ণ ছিল এবং পাথরের তৈরি বিভিন্ন স্থাপনা ছিল। চিচেন ইতজা শহর থেকে কিছু দূরে এই শহরের নিজস্ব “গ্রাম” ছিল যেখানে অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট বসতির অস্তিত্ব ছিল।

চিচেন ইতজা শহরকে দুই অংশে ভাগ করা যায় এবং এই দুই অংশের উন্নয়ন ঘটে দুই সময়কালে। প্রথমাংশের অস্তিত্ব মেলে দক্ষিণ দিকে, যেখানে নেটিভ মায়াদের বসতি ছিল। এই বসতি স্থাপিত হয়েছিল এপিক্লাসিক সময়কালে (৮০০-১০০০ খ্রিস্টাব্দ)। মায়াদের এই বসতিতে যে সকল বাড়িঘর ছিল সেখানে “পাক” স্থাপত্যশৈলী এবং মায়ান হায়ারোগ্লিফ এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। শহরটির নকশা অন্য অংশগুলোর থেকে উত্তর-দক্ষিণ অক্ষে বেশি বিস্তৃত ছিল যা সম্ভবত পানির উৎস জোটোলক সিনোটকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছিল।

আটলান্টাইডসঃ

শহরের দ্বিতীয় অংশের স্থাপনাকাল ধরা হয়েছে এপিক্লাসিক সময়ের পরে অর্থাৎ ১০০০-১২০০ খ্রিস্টাব্দ। শহরের এই অংশকে ঘিরে মেসো-আমেরিকান প্রত্নতত্ত্বে রহস্য এবং বিতর্কের অন্ত নেই। ফ্লোরেসেন্ট স্টাইলে নির্মিত এই শহর টলটেক সভ্যতার চিহ্ন বহন করে। গবেষকদের মতে, হয় টলটেক গোষ্ঠী চিচেন ইতজা দখল করেছিল, নয়তো ইতজারা তাদের সাম্রাজ্য রাজধানী টুলা থেকে আরও ১০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিল, অথবা দুই জাতির মধ্যে কোন ধরণের সমঝোতা হয়েছিল। শহরের দুই অংশের মধ্যে স্থাপত্যশৈলী এবং ভাস্কর্য শিল্পে মিল পাওয়া যায় যার মধ্যে রয়েছে ওয়ারিয়র স্তম্ভ, কুয়েতজাল সদৃশ পাখা যুক্ত র‍্যাটেল স্নেক, ভাস্কর্যের পোশাক, চাক্মুল (হেলান দেয়া ব্যক্তির আকারের বলির কাষ্ঠ), আটলান্টাইডস (দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষের আকৃতির স্তম্ভ), নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রাণীর আদলে নির্মিত স্তম্ভ, একটি যোম্পান্তিল (বলি দেয়া মানুষের খুলি রাখার তাক), ট্লালক (বৃষ্টি দেবতা) এর পূজা দেয়ার ধূপদানি, এবং গ্লিফে উল্লিখিত কিছু ব্যক্তিগত নাম যেগুলো দুই শহরেই খুঁজে পাওয়া গেছে কিন্তু যার কোনটিই মায়া সভ্যতার অংশ নয়।

চিচেন ইতজার-পবিত্র কুয়াঃ

চিচেন ইতজা শহরের উত্তর প্রান্তে বড় সিনোট (পবিত্র কুয়া) অবস্থিত আছে যা মায়ানদের আনুষ্ঠানিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে অপরিমেয় তাৎপর্য বহন করে। বহুল প্রচলিত আছে যে, সিনোটে নরবলি দেয়া হত। ১৯০০ সালের প্রথম দিকে সিনোটে ড্রেজিং করা হয় এবং ড্রেজিং করার পর সিনোট থেকে অসংখ্য মূল্যবান জিনিসপত্র পাওয়া যায় যেগুলো ছিল সোনা, টারকুইস এবং মূল্যবান পাথরের তৈরি। সেই কুয়াতে একই সাথে মানুষের দেহাবশেষও পাওয়া যায় যা সেই সময় নরবলি প্রথার উপস্থিতির প্রমাণ বহন করে। গবেষকেরা প্রাপ্ত দেহাবশেষে আঘাতের চিহ্ন পেয়েছে যা নির্দেশ করে যে, বলির শিকার মানুষগুলোকে কুপে ফেলে দেয়ার পূর্বে মেরে ফেলা হয়েছিল।

রাজধানী রূপে চিচেন ইতজাঃ

৯ম শতকের মধ্যে চিচেন ইতজা হয়ে ওঠে দে ফ্যাক্টো আঞ্চলিক রাজধানী এবং এর শাসক উত্তর এবং মধ্য ইউকাতান পেনিনসুলার বেশিরভাগ অংশ পরিচালনা করতো। উত্তর উপকূলের ইসলা ক্যারিটোস বন্দরের কারণে পুরো আমেরিকায় সোনা, মূল্যবান দ্রব্যাদিসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি-রপ্তানি করার জন্য চিচেন ইতজা হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ধারণা করা হয়, ৫০,০০০ হাজারের বেশি মানুষ বাস করতো এই শহরে। তবে শহরের জনসংখ্যায় পার্থক্য হতে পারে কারণ ইউকাতান এর বাইরে থেকেও মানুষ চিচেন ইতজাতে আসতো বাস করার উদ্দেশ্যে।

চিচেন ইতজার পতনঃ

১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলোম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের ঘটনার মধ্য দিয়ে মায়া সভ্যতার পতন হলেও গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে চিচেন ইতজা তার জৌলুস হারায় তারও অনেক আগে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, চিচেন ইতজার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ মায়াপান শহরে স্থানান্তরিত হয়। মায়াপান ছিল একটি নতুন শহর যা ১২০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে চিচেন ইতজার দক্ষিণ এবং পশ্চিমে নির্মাণ করা হয়। কিছু প্রমাণ নির্দেশ করে যে, সম্ভবত সেই সময় চিচেন ইতজা লুঠতরাজের স্বীকার হয়েছিল যার ফলে চিচেন ইতজার পরিবর্তে মায়াপানকে রাজধানী করা হয়। তবে, যখন স্প্যানীয়রা ১৫২৬ সালে আমেরিকায় জাহাজ ভিড়ায়, তখনো শহরে এবং শহরের আশে পাশে বেশ কিছু বাড়ি ইতজা বাস করতো। আর এর ফলে স্প্যানীয়রা কিছুসময় চিচেন ইতজাকে রাজধানী হিসেবে ব্যবহারও করেছিল।

বর্তমানে চিচেন ইতজাঃ

১৮০০ শতকের মাঝামাঝিতে চিচেন ইতজা একটি অর্থপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে পরিণত হয় এবং আজ পর্যন্ত তেমনি রয়েছে। চিচেন ইতজা শহরের প্রথম দিককার বেশ কিছু নিদর্শন এখনও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। সেগুলো হল- এল ক্যাস্টিলো, দ্য গ্রেট বল কোর্ট, দ্য নর্থ টেম্পল, দ্য স্টিম বাথ, সেকবে নং-১, টেম্পল অব দ্য ওয়ারিওরস, গ্রুপ অব এ থাউজেন্ড কলামস, এল মারকেডো এবং এল ওসারিও।

প্রতিবছর প্রায় ২০ লক্ষাধিক দর্শনার্থীদের পদচারনায় মুখরিত হয় চিচেন ইতজা। মায়ান ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার জন্য চিচেন ইতজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। গবেষকেরা এখনও চিচেন ইতজায় গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন মায়ান সভ্যতা সম্পর্কে নতুন কোন তথ্য আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে।

তুমি এটাও পছন্দ করতে পারো
Loading...