নিজ স্বার্থের কাছে দেশ ও দেশের মানুষ সবই তুচ্ছ ॥ ভরা মৌসুমেও লবণ আমদানির পাঁয়তারা!

ঢাকা টাইমস্‌ রিপোর্ট ॥ আমাদের দেশের কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের কাছে দেশ এবং দেশের মানুষ সব কিছুই যেনো তুচ্ছ। আর তাই তারা নিজের আখের গোটানোর জন্য সব কিছুই করতে পারে। এমনই ঘটনা ঘটেছে লবণ চাষীদের ক্ষেত্রে। লবণ উৎপাদনের ভরা মৌসুমেও ভারত থেকে লবণ আমদানি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে কয়েকটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট!

একটি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, সিন্ডিকেটটি লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার ‘অজুহাত’ দেখিয়ে লবণ আমদানির পাঁয়তারা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে লবণ আমদানির অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। কয়েক দিন আগে ঢাকা থেকে একটি বড় সিন্ডিকেটের সদস্যরা কক্সবাজার ঘুরে গেছে। ওই সিন্ডিকেটকে সহযোগিতা করছে কক্সবাজারের কয়েকজন লবণ মিল মালিক। এদিকে জেলার প্রান্তিক চাষীদের দাবি, আগামী এক সপ্তাহ আবহাওয়া ভালো থাকলে লবণ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।

উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার একেবারে কাছে

কক্সবাজারের বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ১৪ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন। ২১ এপ্রিল পর্যন্ত সাড়ে ১১ লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদিত হয়েছে। কক্সবাজারের ৭ উপজেলা ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী মিলে ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে চলতি মৌসুমে লবণের চাষ হচ্ছে। মার্চের শেষেরদিকে ও এপ্রিলের শুরুতে বৃষ্টিপাতে জেলার লবণ মাঠে কিছুটা ক্ষতি হয়। অভিযোগে জানা যায়, ওই বৃষ্টিপাতের ঘটনাকে পুঁজি করে কক্সবাজার ও ঢাকার কয়েকটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট লবণ আমদানির পাঁয়তারা করছে। সিন্ডিকেটটি দেশের আবহাওয়া অনুকূলে নেই এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না- এমন অজুহাত তুলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আমদানির জন্য আবেদন করেছে। এছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি টিম সম্প্রতি কক্সবাজার, মহেশখালী, টেকনাফ, চকরিয়া, পেকুয়া, কুতুবদিয়া ঘুরে গেছে। তারা আসলে কী উদ্দেশ্যে কক্সবাজার এসেছিল তা প্রশাসনের কেউ জানতে পারেনি। জানতে পারেননি কক্সবাজারের লবণ ব্যবসায়ীরাও। জেলার লবণ ব্যবসায়ী ও চাষীদের অভিযোগ, ওই টিমের সঙ্গে ছিল লবণ আমদানি সিন্ডিকেটের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাদের সঙ্গে ছিল কক্সবাজারের কয়েকজন মিল মালিকও।

লবণ চাষীদের প্রতিক্রিয়া

কক্সবাজার লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি রইজ উদ্দিন জানান, বাইরে থেকে লবণ আমদানি করার প্রশ্নই ওঠে না। আরও অন্তত এক মাস লবণ উৎপাদন হবে। এতে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে লবণ রফতানি করা যাবে। টেকনাফ লবণ চাষী কল্যাণ সমিতির সভাপতি ও টেকনাফ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শফিক মিয়া বলেন, সরকারকে বেকায়াদয় ফেলার জন্য একটি মহল লবণ চাষীদের সরকারের বিরুদ্ধে আবারও মাঠে নামানোর ষড়যন্ত্র করছে। তিনি গুজবে কান না দিয়ে চাষীদের কম দামে লবণ বিক্রি না করার ও লবণ উৎপাদন অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেন। কুতুবদিয়া উপজেলার ১ নং উত্তর ধুরুং ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আসম শাহরিয়ার চৌধুরী বলেন, কুতুবদিয়ায় পুরোদমে লবণ উৎপাদন করা হচ্ছে। অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার অনেক বেশি লবণ উৎপাদন হতে পারে।

এদিকে জেলার সর্বস্তরের লবণ চাষী-ব্যবসায়ী ও মিল মালিকরা যখন লবণ আমদানির বিরুদ্ধে কথা বলছেন, ঠিক তখনই লবণ আমদানির পক্ষে সাফাই গাইলেন সদর উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের লবণ মিল মালিক মাস্টার আবদুল কাদের। তবে তার (মাস্টার আবদুল কাদের) এ কথা মানতে নারাজ জেলার ব্যবসায়ী ও চাষীরা। কারণ বিসিকের সূত্র মতে, চলতি মৌসুমে প্রতি ৪০ শতকে লবণ উৎপাদিত হচ্ছে গড়ে ১৭০ মণ। খুরুশকুলের লবণ চাষী সমিতির নেতা মোর্শেদুর রহমান খোকন বলেন, আগামী এক সপ্তাহ আবহাওয়া ভালো থাকলে প্রচুর পরিমাণে লবণ উৎপাদিত হবে। টেকনাফের হ্নীলার প্রান্তিক লবণ চাষী নুরুল আমিন (৪৫) জানান, সরকার লবণ নীতি ঘোষণার পর থেকে চাষীরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে। ওই সিন্ডিকেটটি লবণ আমদানির পাঁয়তারা করার সঙ্গে লবণের মণ প্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা দাম কমে গেছে। টেকনাফে হ্নীলাস্থ মধুমতি সল্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির কো-অর্ডিনেটর গোলাম আজম খান জানান, লবণ আমদানি করতে হলে অবশ্যই মৌসুম শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। লবণ চাষীরা জানিয়েছে, যেভাবে লবণ উৎপাদিত হচ্ছে তাতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়ে রফতানি করা যাবে। তারপরও কেনো লবণ আমদানির পাঁয়তারা করা হচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মহল লবণ আমদানির এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করে চাষীদের দিকে মনোযোগ দেবেন এটাই অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।

Advertisements
আপনি এটাও পছন্দ করতে পারেন
Loading...